জমির মালিকানা পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রধান আইনি প্রক্রিয়া হলো খারিজ আবেদন।
বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল সেবার কল্যাণে ঘরে বসেই অনলাইনে এই আবেদন সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
এই পদ্ধতির ফলে সাধারণ মানুষ এখন দালালের দৌরাত্ম্য ছাড়াই সরাসরি ই-নামজারি সুবিধা ভোগ করতে পারছেন।
সঠিক নিয়মে আবেদন করলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জমির খতিয়ান এবং ডিসিআর সংগ্রহ করা যায়।
আধুনিক এই ব্যবস্থা ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি সময় ও যাতায়াত খরচ অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে।
তাই নিরাপদ মালিকানা নিশ্চিত করতে এই ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে এবং সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নামজারি বা খারিজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এটি মূলত পূর্ববর্তী মালিকের নাম কেটে নতুন মালিকের নাম নথিভুক্ত করার একটি আইনি প্রক্রিয়া।
জমির নামজারি করার প্রয়োজনীয়তাগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- মালিকানা স্বত্ব নিশ্চিতকরণ: সরকারি রেকর্ড বা খতিয়ানে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে জমির প্রকৃত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়।
- জমি বিক্রয়ে সুবিধা: নামজারি বা নামপত্তন করা না থাকলে ভবিষ্যতে ওই জমি অন্য কারো কাছে আইনত বিক্রি করা সম্ভব হয় না।
- ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান: সরকারের কাছে নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের জন্য নিজের নামে খতিয়ান থাকা বাধ্যতামূলক।
- ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি: জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করতে চাইলে মালিকানার প্রমাণ হিসেবে নামজারি খতিয়ান প্রয়োজন হয়।
- স্থাপনা নির্মাণে অনুমতি: জমিতে ভবন বা কোনো স্থাপনা নির্মাণের জন্য রাজউক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেতে নামজারি আবশ্যক।
- জটিলতা ও মামলা রোধ: সঠিক সময়ে নামজারি করলে একই জমি বারবার বিক্রি বা অবৈধ দখল সংক্রান্ত আইনি জটিলতা থেকে বাঁচা যায়।
- উত্তরাধিকার সূত্রে বণ্টন: পৈতৃক জমি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে আলাদা খতিয়ান তৈরি করতে নামজারি বা খারিজ করতে হয়।
অনলাইনে জমির নামজারি বা খারিজ আবেদন করার নিয়ম
জমির নামজারি বা খারিজ (e-Mutation) আবেদন করার প্রক্রিয়াটি এখন অনেক সহজতর করা হয়েছে।
নিচে ধাপে ধাপে এর নিয়মগুলো দেওয়া হলো:
১. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা
আবেদন শুরু করার আগে নিচের ডকুমেন্টগুলোর স্ক্যান কপি (PDF বা JPEG) হাতে রাখুন:
- মূল দলিলের কপি এবং ভায়া দলিলের কপি (প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে)।
- সর্বশেষ খতিয়ান (সিএস/এসএ/আরএস/বিএস)।
- আবেদনকারীর এনআইডি (NID) কার্ডের কপি।
- উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশন সনদ (৩ মাসের বেশি পুরনো নয়)।
- ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের দাখিলা।
- আবেদনকারীর ছবি ও স্বাক্ষর।
২. ওয়েব পোর্টালে প্রবেশ
প্রথমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট land.gov.bd-এ প্রবেশ করুন এবং “নামজারি আবেদন” ট্যাবে ক্লিক করুন।
এখান থেকে মিউটেশন বাটনে ক্লিক করুন।
৩. নতুন আবেদন করা
‘নতুন আবেদন করতে ক্লিক করুন’ বাটনে ক্লিক করুন। এখান থেকে নাম, মোবাইল নম্বর, পাসওয়ার্ড, ক্যাপাচা দিয়ে একাউন্ট তৈরি করতে হবে। এরপর ‘পাসওয়ার্ড হালনাগাদ করুন’ বাটনে ক্লিক করুন।
৪. প্রোফাইলে যাওয়া
একাউন্টের ড্যাশবোর্ড থেকে ‘প্রোফাইল’ এ ক্লিক করুন। এখান থেকে ভেরিফিকেশন থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করুন বাটনে ক্লিক করুন।
এরপর NID নম্বর, তারিখ, নাম ইংরেজিতে, পিতার ও মাতার নাম বাংলায় দিতে হবে। এভাবে প্রোফাইলে তথ্যগুলি দিতে হবে।
৫. মিউটেশন করা
এরপর ড্যাশবোর্ড থেকে ‘মিউটেশন’ এ ক্লিক করুন।
এখান থেকে ‘নতুন আবেদন করুন’ বাটনে ক্লিক করুন।
৬. কোর্ট ফি প্রদান
নতুন আবেদন করুন বাটনে ক্লিক করার পর, কোর্ট ফি ২০ টাকা পরিশোধ করতে হবে সিলেক্ট করুন।
এখান থেকে নাম, জাতীয় পরিচয় পত্র, বিভাগ,জেলা, জন্ম তারিখ, উপজেলা, মোবাইল , ঠিকানা দিয়ে ‘পরবর্তী’ বাটনে ক্লিক করুন।
এরপর এখান থেকে ইন্টারনেট ব্যাংকিং থেকে বিকাশ/নগদ/উপায় ইত্যাদির মাধ্যমে ২০ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
৭. আবেদন ফরম পূরণ
কোর্ট ফি পরিশোধের পর আবেদন ফরম বাটনে ক্লিক করুন।
এরপর ‘সরকারি রেকর্ডীয় মালিকের খতিয়ান হতে’ সিলেক্ট করুন।
এবার আপনি কিভাবে মালিকানা অর্জন করতে চাচ্ছেন, তা সিলেক্ট করুন।
এখানে প্রথম দুইটি প্রশ্নের উত্তর হিসেবে না তে সিলেক্ট করুন।
এরপর ওয়ারিশ অনুযায়ী আবেদনকৃত জমির তফসিলে বিভাগ,জেলা, উপজেলা, মৌজা দিতে হবে।
এগুলি দেওয়া হয়ে গেলে ‘জমির তথ্য যুক্ত করুন’ বাটনে ক্লিক করুন
৮. জমির তথ্য দেওয়া
‘জমির তথ্য যুক্ত করুন’ বাটনে ক্লিক করে হোল্ডিং নম্বর, জরিপের নাম, খতিয়ান নম্বর, দাগ নং, আবেদনে বর্ণিত শেণি, আবেদনে বর্ণিত তফসিল দিয়ে ‘সম্পাদনা’ বাটনে ক্লিক করুন।
ওয়ারিশ হিসেবে আবেদনকারির তথ্য, ওয়ারিশের তথ্য সংযুক্ত করুন। অবশ্যই জমির ভাগ দেখিয়ে দিতে হবে।
বন্টননামা ও ওয়ারিশ সনদ সংযুক্ত করতে হবে।
দাতার তথ্য সংযুক্ত করতে হবে। এরপর ‘সংরক্ষণ ও পরবর্তী বাটনে ক্লিক করুন।
এরপর কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ‘আবেদন দাখিল করুন’ বাটনে ক্লিক করুন।
৯. ফি প্রদান
এখান থেকে ইন্টারনেট ব্যাংকিং থেকে বিকাশ/নগদ/উপায় ইত্যাদির মাধ্যমে ৫০ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
১০. আবেদন দাখিল তথ্য
এরপর আবেদন নম্বর দেখতে পাবেন। এই আবেদনটি প্রিন্ট করতে হবে।
১১. কার্যালয়ে জমা দেওয়া
আবেদনপত্র প্রিন্ট কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কপি নিয়ে ভুমি অফিসে যেতে হবে।
আর আবেদনটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও এসি ল্যান্ড (AC Land) অফিস যাচাই করবে।
যাচাই শেষে মোবাইলে এসএমএস-এর মাধ্যমে শুনানির তারিখ জানানো হবে।
নির্ধারিত দিনে মূল কাগজপত্রসহ উপস্থিত হয়ে শুনানি শেষ করতে হবে।
১২. খতিয়ান সংগ্রহ
আবেদন মঞ্জুর হলে মোবাইলে মেসেজ আসবে।
এরপর অনলাইনে ১,১০০ টাকা (ডিসিআর ফি) পরিশোধ করলেই আপনার ডিজিটাল খতিয়ান ও ডিসিআর তৈরি হয়ে যাবে, যা আপনি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিতে পারবেন।
অনলাইনে জমির নামজারি বা খারিজ আবেদন করতে খরচ
জমির নামজারি বা খারিজ করার জন্য সরকারিভাবে নির্ধারিত মোট খরচ ১,১৭০ টাকা।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হয় এবং নগদ লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
খরচের বিস্তারিত ব্রেকডাউন নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রাথমিক আবেদন ফি (আবেদন করার সময় দিতে হয়)
-
কোর্ট ফি: ২০ টাকা
-
নোটিশ জারি ফি: ৫০ টাকা
-
মোট: ৭০ টাকা (এটি আবেদন সাবমিট করার সময় বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে দিতে হয়)
২. অনুমোদন পরবর্তী ফি (আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর দিতে হয়)
-
রেকর্ড সংশোধন বা হালকরণ ফি: ১,০০০ টাকা
-
খতিয়ান সরবরাহ ফি: ১০০ টাকা
-
মোট: ১,১০০ টাকা (এটি ডিসিআর বা DCR ফি হিসেবে পরিচিত)
FAQ:অনলাইনে জমির নামজারি বা খারিজ আবেদন
নামজারি বা খারিজ আবেদন করতে মোট কত টাকা খরচ হয়?
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মোট খরচ ১,১৭০ টাকা (আবেদন ফি ৭০ টাকা এবং ডিসিআর ফি ১,১০০ টাকা)।
আবেদন করার কতদিন পর নামজারি সম্পন্ন হয়?
সাধারণত আবেদন করার ২৮ থেকে ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে নামজারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষে সময় কম-বেশি হতে পারে।
অনলাইনে আবেদন করার পর কি ভূমি অফিসে যেতে হয়?
হ্যাঁ, আবেদনের সত্যতা যাচাই ও শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে নির্দিষ্ট তারিখে মূল কাগজপত্রসহ উপস্থিত হতে হয়।
খতিয়ান ও ডিসিআর (DCR) কীভাবে পাব?
আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর নির্দিষ্ট ফি অনলাইনে পরিশোধ করলে ওয়েবসাইট থেকেই কিউআর কোড যুক্ত ডিজিটাল খতিয়ান ও ডিসিআর ডাউনলোড করা যায়।
আবেদন বাতিল হলে করণীয় কী?
এটি বাতিল হলে এসটি ল্যান্ড (AC Land) বরাবর মিস কেস বা আপিল করা যায় অথবা ত্রুটি সংশোধন করে পুনরায় নতুন করে আবেদন করা যায়।
নামজারি ফি কি নগদে পরিশোধ করা যায়?
না, নামজারি ফি বা ডিসিআর ফি এখন সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে (বিকাশ, নগদ, রকেট বা কার্ডের মাধ্যমে) পরিশোধ করতে হয়।
উপসংহার – অনলাইনে জমির নামজারি বা খারিজ আবেদন
পরিশেষে বলা যায়, জমির মালিকানা নিষ্কণ্টক ও নিরাপদ রাখতে খারিজ আবেদন বা নামজারির কোনো বিকল্প নেই।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিসেবা এখন হাতের নাগালে আসায় সাধারণ মানুষ যেমন হয়রানি থেকে মুক্তি পাচ্ছেন, তেমনি সরকারি ভূমি ব্যবস্থাপনাও অনেক স্বচ্ছ হয়েছে।
সঠিক কাগজপত্র ও সরকারি নির্ধারিত ফি ব্যবহার করে নিজের জমি নিজেই নামজারি করে নিন।
মনে রাখবেন, সময়মতো নামজারি না করা থাকলে ভবিষ্যতে জমি বিক্রয় বা উত্তরাধিকার বন্টনে বড় ধরণের আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তাই ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা এড়াতে এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে আজই অনলাইনে আবেদনের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করুন।
আপনার পছন্দ হতে পারে এমন আরো পোস্ট


