এখন ঘরে বসেই অনলাইনে ভোটার আইডি কার্ড নাম সংশোধন করা যায়।

বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি (NID) কার্ড এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে সরকারি ভাতা গ্রহণ, পাসপোর্ট তৈরি কিংবা সিম কার্ড কেনা, সবখানেই জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন পড়ে।

কিন্তু অনেক সময় অসাবধানতাবশত এই কার্ডে আমাদের নামের বানান ভুল থেকে যায়।

সামান্য একটি অক্ষরের ভুলও ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

আগে এনআইডি সংশোধনের জন্য নির্বাচন অফিসে যেতে হতো। এটা অনেক ঝামেলার ছিল।

এখন, এই পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইন সেবার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

এখন আপনি ঘরে বসেই আপনার স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে ভোটার আইডি কার্ডের নাম পরিবর্তনের আবেদন করতে পারেন।

আজকের এই ব্লগে আমরা জানবো, কীভাবে সঠিক নিয়মে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে অনলাইনে আপনার এনআইডি-র নাম সংশোধন করবেন।

ভোটার আইডি কার্ড বা এনআইডি (NID) কার্ডে নামের বানান সঠিক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামান্য একটি অক্ষরের ভুলের কারণেও আপনাকে অনেক বড় ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে।

ভোটার আইডি কার্ড নাম সংশোধন

মূলত যে কারণগুলোর জন্য নাম সংশোধন করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়, সেগুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. বাংলাদেশে সরকারি যেকোনো সুবিধা পেতে হলে এনআইডি কার্ডের তথ্য নির্ভুল হতে হয়।

২. ব্যাংকে হিসাব খোলা, লোন নেওয়া বা বড় কোনো আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এনআইডি কার্ডের তথ্য যাচাই করা হয়।

৩. আপনি যদি বিদেশে যেতে চান, তবে পাসপোর্টের তথ্যের সাথে এনআইডি-র তথ্যের মিল থাকা বাধ্যতামূলক।

৪. এসএসসি বা এইচএসসি সার্টিফিকেটের নামের সাথে এনআইডি-র নামের মিল না থাকলে চাকরির আবেদন বা উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তিতে সমস্যা হয়।

৫. জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচা এবং রেজিস্ট্রেশনের সময় এনআইডি কার্ড প্রয়োজন হয়।

ভোটার আইডি কার্ড নাম সংশোধন করতে কি কি লাগে

ভোটার আইডি কার্ড বা এনআইডি-তে নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে আপনি কীসের ভিত্তিতে নাম পরিবর্তন করছেন, তার উপর ভিত্তি করে কাগজপত্রের ধরন ভিন্ন হয়।

সাধারণত নিচে দেওয়া ডকুমেন্টগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পড়ে:

শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ (জেএসসি, এসএসসি বা এইচএসসি পাসের সার্টিফিকেট), অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট / ড্রাইভিং লাইসেন্স, কাবিননামা (বিয়ের পর নাম পরিবর্তন), তালাকনামা (ডিভোর্সের পর নাম পরিবর্তন), ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের হলফনামা (Affidavit) এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির কপি। (পুরো নাম পরিবর্তন)

নাম সংশোধন করতে কত টাকা লাগে

ভোটার আইডি কার্ড বা এনআইডি সংশোধনের খরচ নির্ভর করে আপনি কতবার সংশোধন করছেন এবং কোন ধরনের তথ্য পরিবর্তন করছেন তার ওপর।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফি অনুযায়ী ২০২৬ সালের বর্তমান খরচ নিচে দেওয়া হলো:

১. ব্যক্তিগত তথ্য সংশোধন (নাম, জন্ম তারিখ, পিতা/মাতা ইত্যাদি) – ২৩০ টাকা (প্রথমবার), ৩৪৫ টাকা (২য়বার), ৫৭৫ টাকা (পরবর্তি বার)

২. অন্যান্য তথ্য সংশোধন (ঠিকানা, রক্তের গ্রুপ, পেশা ইত্যাদি) – ১১৫ টাকা (প্রথমবার), ২৩০ টাকা (২য়বার), ৩৪৫ টাকা (পরবর্তি বার)

৩. উভয় ধরনের তথ্য একসাথে সংশোধন – ৩৪৫ টাকা (প্রথমবার), ৫৭৫ টাকা (২য় বার), ৮৬৩ টাকা (পরবর্তি বার)

ভোটার আইডি কার্ড নাম সংশোধন করার উপায়

অনলাইনে এনআইডি (NID) বা ভোটার আইডি কার্ডের নাম সংশোধন করার প্রক্রিয়াটি এখন বেশ আধুনিক এবং সহজ।

আপনি চাইলে নিজের স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করেই এটি করতে পারেন।

নিচে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি দেওয়া হলো:

ধাপ ১: অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রেশন

প্রথমে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/ এ যান।

এরপর ‘রেজিস্ট্রেশন’ বাটনে ক্লিক করে আপনার এনআইডি নম্বর, জন্ম তারিখ এবং ক্যাপচা কোড দিয়ে এগিয়ে যান।

আপনার এনআইডি কার্ড অনুযায়ী বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার বিভাগ, জেলা ও উপজেলা সিলেক্ট করুন।

আপনার সচল একটি মোবাইল নম্বর দিন এবং প্রাপ্ত ওটিপি (OTP) কোডটি ইনপুট করুন।

ধাপ ২: ফেস ভেরিফিকেশন (NID Wallet)

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আপনার পরিচয় নিশ্চিত করতে মুখমণ্ডল স্ক্যান করতে হবে।

গুগল প্লে-স্টোর থেকে ‘NID Wallet‘ অ্যাপটি ডাউনলোড করুন।

ওয়েবসাইটে দেওয়া কিউআর (QR) কোডটি অ্যাপ দিয়ে স্ক্যান করুন।

নির্দেশনা অনুযায়ী আপনার মুখমণ্ডল ডানে, বামে এবং সোজাসুজি স্ক্যান সম্পন্ন করুন। ভেরিফিকেশন সফল হলে আপনি প্রোফাইলে প্রবেশ করতে পারবেন।

ধাপ ৩: তথ্য পরিবর্তন ও এডিট

প্রোফাইলে প্রবেশের পর ‘ব্যক্তিগত তথ্য’ ট্যাবে ক্লিক করুন।

উপরে ডান কোণায় থাকা ‘এডিট’ বাটনে ক্লিক করুন। (এখানে ক্লিক করলে আপনাকে ফি প্রদানের কথা মনে করিয়ে দেবে)।

এবার আপনার নামের বানান (বাংলা ও ইংরেজি) যেখানে ভুল আছে, সেটি সংশোধন করে সঠিকটি লিখুন।

ধাপ ৪: ফি প্রদান (বিকাশ/রকেট/নগদ)

আবেদন সাবমিট করার আগে আপনাকে সরকারি ফি জমা দিতে হবে।

বিকাশ বা নগদের ‘Bill Pay’ অপশনে গিয়ে NID Service সিলেক্ট করুন।

আবেদনের ধরন (Info Correction) সিলেক্ট করে ফি প্রদান করুন।

সাধারণত প্রথমবারের জন্য ২৩০ টাকার মতো ফি লাগে। ফি দেওয়ার কিছুক্ষণ পর আপনার প্রোফাইলে সেটি আপডেট দেখাবে।

ধাপ ৫: কাগজপত্র আপলোড ও সাবমিট

আপনার সংশোধিত নামের সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (যেমন: এসএসসি সার্টিফিকেট বা জন্ম নিবন্ধন) স্ক্যান করে আপলোড করুন।

সবকিছু ঠিক থাকলে ‘Submit’ বাটনে ক্লিক করুন।

আবেদন শেষে একটি ‘Summery Form’ ডাউনলোড করার অপশন পাবেন, সেটি সংরক্ষণ করুন।

ধাপ ৬: সংশোধিত কার্ড হাতে পাওয়া

আবেদনটি অনুমোদিত হতে সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবস সময় লাগে।

অনুমোদিত হলে আপনার মোবাইলে মেসেজ আসবে।

তখন আপনি ওয়েবসাইট থেকে নতুন ডিজিটাল এনআইডি কার্ডটি ডাউনলোড করে ল্যামিনেটিং করে ব্যবহার করতে পারবেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. অনলাইনে নাম সংশোধন করতে কতদিন সময় লাগে?

সাধারণত আবেদন করার পর ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশোধন সম্পন্ন হয়।

২. এনআইডি কার্ড সংশোধন কি মোবাইলে করা সম্ভব?

অবশ্যই! আপনি আপনার ফোনের ব্রাউজার ব্যবহার করে এনআইডি পোর্টালে লগইন করতে পারেন।

৩. আবেদন বাতিল হলে কি টাকা ফেরত পাব?

দুর্ভাগ্যবশত, আবেদন বাতিল হলে সরকারি ফি ফেরত পাওয়া যায় না।

৪. সংশোধন হওয়ার পর নতুন কার্ডটি কীভাবে পাব?

আবেদন অনুমোদিত হলে আপনার মোবাইলে এসএমএস আসবে।

এরপর আপনি এনআইডি ওয়েবসাইট থেকে আপনার প্রোফাইলে লগইন করে ‘ডাউনলোড’ অপশন থেকে রঙিন ডিজিটাল এনআইডি কপিটি সংগ্রহ করতে পারবেন।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ভোটার আইডি কার্ড বা এনআইডি-তে নামের বানান সংশোধন করা এখন আর আগের মতো জটিল কোনো কাজ নয়।

এখন আপনি আপনার স্মার্টফোন ব্যবহার করেই ঘরে বসে নির্ভুলভাবে নাম পরিবর্তনের আবেদন করতে পারেন।

আপনার এনআইডি-তে সামান্য ভুল থাকলেও সেটি অবহেলা না করে দ্রুত সংশোধন করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

কারণ, সামান্য ভুলের কারণে ভবিষ্যতে অনেক বড় সমস্যা হতে পারে।