অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটার নিয়ম সকলের জানা উচিত। কেননা ট্রেনে যাতায়াত করা খুবই আরামদায়ক ও নিরাপদ হয়ে থাকে।
আর ট্রেনে সাধারণত খুব বেশি দুর্ঘটনা ঘটে না। তাই আপনার ভ্রমণকে অনেক বেশি নিরাপদ করার জন্য ট্রেনে যাতায়াত করা ভালো।
এছাড়া বেশিরভাগ সময়ই ট্রেনে যাতায়াত করলে আপনার গন্তব্যস্থলে খুব কম সময়ে পৌঁছানো যায়।
আর আজকাল ট্রেনগুলি আগের তুলনায় অনেক আধুনিক হওয়ায়, এই পথে যাতায়াত করা অনেক আরামদায়ক হয়ে থাকে।
তবে ট্রেনে যাতায়াতের একটি বড় অসুবিধা হলো, ট্রেনের টিকিট কাটা।
সাধারণত ট্রেনের কাউন্টার গুলিতে অনেক বড় ও লম্বা লাইন থাকার জন্য টিকিট কাটতে অনেক বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।
এই সমস্যার সমাধানের জন্য আপনি অনলাইন ট্রেন টিকিট বুকিং করতে পারেন।
এই ব্লগে আমরা জানতে পারবো কিভাবে আপনি খুব সহজেই ট্রেন টিকিট অনলাইন থেকে কিনতে পারবেন।
অনলাইন থেকে ট্রেনের টিকিট কাটার মাধ্যমে আপনার গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য কষ্ট করে রেল স্টেশনে টিকিট কাউন্টারে যেতে হবে না।
এছাড়া আপনাকে লাইনে দাঁড়াতে হবে না। আর আপনার টিকিট না পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে।
কেননা অনলাইনে যেহেতু দশ দিন আগেই টিকিট কাটা যায়,তাই টিকিট না পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কম থাকে।
তবে অনলাইনে টিকিট কাটার ক্ষেত্রে কিছু জিনিসের প্রয়োজন হবে।
সেগুলি হল –
১. আপনার জাতীয় পরিচয় পত্র (এন আই ডি)
২. আপনার একটি সচল মোবাইল নম্বর
৩. পেমেন্ট করার জন্য বিকাশ, নগদ, রকেট বা ডেবিট /ক্রেডিট কার্ড।
৪. ইন্টারনেট যুক্ত একটি স্মার্টফোন অথবা কম্পিউটার ( ডেস্কটপ/ল্যাপটপ)
এই ৪টি জিনিস থাকলে আপনি অনায়াসেই অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটতে পারবেন।
অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটার সম্পূর্ণ ধাপ সমূহ
আপনি অনলাইনে দুইটি মাধ্যমে ট্রেনের টিকিট কাটতে পারবেন।
একটি হলো ট্রেনের টিকিট কাটার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। আর একটি হলো ট্রেনের টিকিট কাটার অ্যাপস এর মাধ্যমে।
দুই মাধ্যমেই মূলত ট্রেনের টিকিট কাটার নিয়ম একই। আপনি চাইলে যে কোন মাধ্যমে এভাবে টিকিট কাটতে পারেন।
অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটার নিয়মগুলি ধাপ অনুযায়ি দেখে নিন।
প্রথম ধাপ: রেজিস্ট্রেশন বা লগিন
ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য আপনার মোবাইল বা কম্পিউটারে ভালো ইন্টারনেট সংযোগ থাকতে হবে।
আপনি যদি প্রথমবার টিকিট কাটতে চান, সেক্ষেত্রে আপনাকে প্রথমে বাংলাদেশ রেলওয়ের পোর্টালে নিবন্ধন করতে হবে।
এর জন্য আপনাকে eticket.railway.gov.bd ওয়েবসাইট এ যেতে হবে।
এছাড়া আপনি চাইলে আপনার মোবাইললের গুগল প্লে স্টোর অ্যাপ থেকে Rail sheba অ্যাপটি ইন্সটল করে নিতে পারেন।
- ওয়েবসাইট অথবা অ্যাপের Register বাটনে ক্লিক করতে হবে।
- এরপর আপনার মোবাইল নম্বর, এন আই ডি নম্বর ও জন্ম তারিখ দিতে হবে।
- এছাড়া ভেরিফিকেশনের জন্য আপনার মোবাইল নাম্বারে একটি ওটিপি (OTP) কোড আসবে। সেই কোডটি দিয়ে ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করতে হবে।
- এরপর আপনাকে একটি পাসওয়ার্ড সেট করে রেজিস্ট্রেশন কমপ্লিট করে, একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। এই অ্যাকাউন্ট দিয়েই আপনি প্রতিবার লগইন করতে পারবেন।
২য় ধাপ: আসন খোঁজা
একাউন্ট তৈরি হয়ে গেলে অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য আমাদেরকে একটি ফরম ফিলাপ করতে হবে।
এই ফর্মে আপনি কোথায় থেকে যাত্রা শুরু করবেন এবং কোথায় আপনি যেতে চান।
কবে যাবেন, কতজন যাবেন, আপনার সিটের ক্লাস কি রকম হবে (shovon/ac ইত্যাদি) এই সকল কিছু এই ধাপে পুরণ করতে হবে।
সম্পূর্ণ ফর্মটি পূরণ করা হয়ে গেলে, Search Trains অপশনে ক্লিক করতে হবে।
৩য় ধাপ: আসন বুকিং ও পেমেন্ট
Search Trains অপশনে ক্লিক করার পর আপনি আপনার যাত্রার কাঙ্ক্ষিত ট্রেনগুলি দেখতে পাবেন।
- আপনি যেই ট্রেনে যাবেন, সেই ট্রেনের জন্য এখান থেকে আপনার আসন বা সিট বুকিং করতে পারবেন।
- ফাঁকা আসন গুলি সাধারণত সাদা রঙ দেখাবে। আর যে আসন গুলি বুক হয়ে গেছে সেগুলি হলুদ রঙে দেখাবে।
- আপনি যে আসনে টিকিট নিতে চান, সেটি আপনি যে ক্লাসে পছন্দ করেছিলেন, সেই ক্লাস অনুযায়ী আপনাকে দেখাবে।
- এখান থেকে আপনাকে, ফাঁকা যেকোনো একটি কামরা সিলেক্ট করে, আপনার আসন সিলেক্ট করে নিতে হবে।
- এরপর continue purchase বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এখান থেকে আপনার নাম্বারে একটি ওটিপি আসবে। - সেই ওটিপি দিয়ে ভেরিফাই করতে হবে। এরপর আপনার নাম দিয়ে ও Adult/child সিলেক্ট করে proceed বাটনে ক্লিক করতে হবে।
- এরপর আপনার বিকাশ নগদ রকেট বা ক্রেডিট কার্ড অপশন থেকে পেমেন্ট করার জন্য proceed to payment বাটনে ক্লিক করতে হবে। এরপর আপনার পেমেন্ট নাম্বার দিয়ে পেমেন্ট করে দিতে হবে। এর জন্য আপনাকে পিন নাম্বার ও ওটিপি অবশ্যই দিতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: টিকিট ডাউনলোড ও প্রিন্ট করা
পেমেন্ট সম্পন্ন করার পর অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটার চতুর্থ ধাপে আপনাকে আপনার টিকিট সঠিকভাবে ডাউনলোড করতে হবে।
- এর জন্য আপনার পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে আপনি টিকিট পেয়ে যাবেন।
- এই টিকিটটি আপনি আপনার মোবাইলে ডাউনলোড করে রাখতে পারেন।
- এছাড়া সবথেকে ভালো হয় আপনি যদি এই টিকিট প্রিন্ট করে তার কপি নিজের কাছে রেখে দিতে পারেন।
অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কেটে ভ্রমণের জন্য যে সকল বিষয় খেয়াল রাখতে হবে
ট্রেনে ভ্রমণ যেহেতু অনেক আরামদায়ক ও কম খরচের হয়, তাই এই ভ্রমণে অনলাইন থেকে টিকিট কাটার জন্য প্রতিদিন প্রচুর মানুষ তাদের ওয়েবসাইট ও অ্যাপে প্রবেশ করে।
তাই এখানে টিকিট কাটার জন্য প্রচুর প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। এর জন্য আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম জানা জরুরী।
এছাড়া আপনার ভ্রমণ যেন নিরাপদ হয়, এজন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
জেনে নিন ট্রেনে টিকিট কেটে ভ্রমণের জন্য কি কি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে –
১. ভ্রমণের ৮-১০ দিন পূর্বে টিকিট কাটাঃ
আপনার অবশ্যই কোথাও ভ্রমণ করার কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ দিন আগে টিকিট কাটা উচিত। এক্ষেত্রে আপনার আসন পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
২. ভ্রমণের দিন এন আইডি কার্ড সাথে রাখাঃ
ভ্রমণের দিন অবশ্যই আপনার সাথে আপনার এনআইডি কার্ড সাথে রাখা। এটা সম্ভব না হলে আপনাকে এনআইডি কার্ডের ফটোকপি সাথে রাখতে হবে।
একজন NID বা জাতীয় পরিচয় পত্র থাকা ব্যক্তি একসাথে সর্বোচ্চ ৪টি টিকিট কিনতে পারেন।
৩. ট্রেনের টিকিট বাতিল করার নিয়মঃ
যদি আপনার ট্রেনের টিকিট ফেরত দিতে চান বা বাতিল করতে চান, সেক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই ট্রেন ছাড়ার একটি নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে ওয়েবসাইট অথবা অ্যাপের মাধ্যমে টিকিট বতিল করতে পারবেন।
এছাড়া এটি সরাসরি কাউন্টার থেকেও করা যায়। তবে এক্ষেত্রে আপনার সম্পূর্ণ টিকিটের দাম ফেরত পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
এখানে আপনার টিকিট ফেরত দেওয়ার সময় সাপেক্ষে টিকিটের দাম কর্তন করে ফেরত দেয়া হতে পারে।
৪. শিশুদের ট্রেনের টিকিট কাটার নিয়মঃ
সাধারণত ৩ থেকে ১২ বছরের শিশুদের জন্য ট্রেনের টিকিটে অর্ধেক বা ৫০% ভাড়ার প্রয়োজন পড়ে।
এছাড়া ৩ বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে কোন প্রকার ভাড়ার প্রয়োজন পড়ে না।
তবে সেক্ষেত্রে সেই শিশুদের তাদের অভিভাবকের সাথে আসন ভাগাভাগি করে বসতে হয়।
তাদের জন্য অতিরিক্ত কোন আসনের ব্যবস্থা করা হয় না। তবে আপনি যদি আপনার ৩ বছরের নিচের শিশুর জন্য একটি অতিরিক্ত আসন চান।
সে ক্ষেত্রে আপনাকে একটি ৩ থেকে ১২ বছরের শিশুদের জন্য থাকা সিট নিতে হবে।
অর্থাৎ আপনি ৫০% ভাড়ার একটি সিট পাবেন। এক্ষেত্রে আপনাকে টিকিট বুকিং করার সময় child সিলেক্ট করতে হবে।
শিশুর বয়স প্রমাণের জন্য, আপনার সাথে তাদের বার্থ সার্টিফিকেট ভ্রমণের সময় সাথে নেওয়া জরুরী।
এক্ষেত্রে টিকিট চেক করার সময় কোন প্রকার ঝামেলার সম্মুখীন হতে হবে না।
FAQ: অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটার নিয়ম
১. ট্রেনের টিকিট কাটার ওয়েবসাইট ও অ্যাপের নাম কি?
অনলাইন থেকে ট্রেনের টিকিট কাটার ওয়েবসাইট হলো – eticket.railway.gov.bd. আর ট্রেনের টিকিট কাটার অ্যাপ হল- Rail Sheba
২. ট্রেনে ভ্রমণের সময় টিকিটের সাথে কি কি কাগজ রাখতে হবে?
অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কেটে ট্রেনে ভ্রমণের সময় অবশ্যই ট্রেনের টিকিটের পিডিএফ প্রিন্ট আকারে থাকতে হবে।
এটা মোবাইলে পিডিএফ আকারে থাকলেও হবে। এছাড়া সাথে থাকতে হবে তিনি টিকিট কেটেছেন, তার Nid card.
এছাড়া আপনার সাথে আপনার শিশু ভ্রমণ করলে, তাদের বয়সের প্রমাণস্বরূপ জন্ম নিবন্ধন সনদ সাথে রাখতে হবে।
৩. ট্রেনের টিকিট সাধারণত ভ্রমণের কত দিন আগে কাটা যায়?
আপনি আপনার ভ্রমণের ১০ দিন আগে ট্রেনের টিকিট কাটতে পারবেন।
৪. একজন ব্যক্তি একটি অ্যাকাউন্ট থেকে কয়টি ট্রেনের টিকিট কাটতে পারেন?
একজন ব্যক্তি তার অ্যাকাউন্ট থেকে সর্বোচ্চ ৪টি টিকিট কাটতে পারবেন। এভাবে তিনি সপ্তাহে দুইবার টিকিট কাটতে পারবেন।
৫. যার নামে টিকিট কাটা হবে, তিনি ছাড়াও বাকি সদস্যদের ও কি এনআইডি কার্ড থাকতে হবে?
না। যার নামে টিকিট কাটা হবে তিনি ছাড়া অন্য কারো এনআইডি কার্ড লাগবে না।
তবে যার অ্যাকাউন্ট থেকে টিকিট কাটা হয়েছে তাকে অবশ্যই ভ্রমণে থাকতে হবে এবং তার Nid Card সাথে থাকতে হবে।
উপসংহার: অনলাইনে ট্রেনের টিকিট কাটার নিয়ম
এই ব্লগটিতে কিভাবে আপনি খুব সহজেই অনলাইন থেকে ট্রেনের টিকিট কাটতে পারবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
আশা করি আপনি এখন খুব সহজেই নিজের একটি অ্যাকাউন্ট খুলে ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে ট্রেনের টিকিট কাটতে পারবেন।
তবে আপনাকে অবশ্যই ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য ভুয়া ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
যেহেতু এখানে পেমেন্ট ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে রয়েছে, যেহেতু আপনাকে অবশ্যই টিকিট কাটার জন্য সঠিক ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করতে হবে।
মূলত অনলাইনের মাধ্যমে ট্রেনের টিকিট কাটার প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ।
আর আপনার নিরাপদ ভ্রমণের জন্য, আপনি এভাবে টিকিট কেটে ভ্রমণ করতে পারেন।
আপনার পছন্দ হতে পারে এমন আরো পোস্ট


