এখন পারিবারিক সনদ অনলাইন আবেদন করা একদম সহজ।
এক সময় একটি পারিবারিক সনদ বা ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করতে ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা পৌরসভার বারান্দায় দিনের পর দিন ঘুরতে হতো।
কিন্তু বর্তমানে সেই ঝামেলা আর নেই।
আপনি এখন ঘরে বসেই স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইনে পারিবারিক সনদের আবেদন করতে পারেন।
এতে আমরা ঝামেলা বিহীনভাবে আবেদন করার পাশাপাশি নির্ভুলভাবে আবেদন করতে পারি।
এই ব্লগে আমরা আলোচনা জানবো, কিভাবে ঘরে বসে পারিবারিক সনদের জন্য আবেদন করা যায় ও এর জন্য কী কী কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়।
পারিবারিক সনদ মূলত একটি পরিবারের সদস্য তালিকার সত্যায়িত প্রমাণপত্র।
এটি সাধারণত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (যেমন: ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন) প্রদান করে থাকে।

মূলত একটি পরিবারে কতজন সদস্য আছেন এবং তাদের পরিচয় কী, তার সরকারি স্বীকৃতিই হলো এই সনদ।
এই সনদ যে কারণে প্রয়োজন, তা হল-
১. কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার রেখে যাওয়া স্থাবর (জমি, বাড়ি) বা অস্থাবর (গাড়ি, স্বর্ণ) সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে আইনত ভাগ করার জন্য পারিবারিক সনদের প্রয়োজন হয়।
২. যদি কোনো ব্যক্তি মারা যান এবং তার ব্যাংক একাউন্ট বা পোস্ট অফিসে জমানো টাকা থাকে, তবে সেই টাকা উত্তোলনের জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পারিবারিক সনদ বা সাকসেশন সার্টিফিকেট দাবি করে।
৩. চাকরিজীবী কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার পেনশন বা গ্র্যাচুইটির টাকা পাওয়ার জন্য তার পরিবারকে এই সনদ জমা দিতে হয়।
৪. আদালতে কোনো মামলা-মোকাদ্দমা বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিবাদ মীমাংসার ক্ষেত্রে পারিবারিক সনদ প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
৫. কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের (Immigration) আবেদন বা ফ্যামিলি রিইউনিয়ন ভিসার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর সাথে পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক প্রমাণের জন্য এই সনদের ইংরেজি কপি প্রয়োজন হয়।
৬. সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন বিশেষ ভাতা (যেমন: মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বিধবা ভাতা বা দুর্যোগকালীন সাহায্য) পাওয়ার ক্ষেত্রে উপযুক্ত সদস্য হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে এই সনদ লাগে।
পারিবারিক সনদ করতে কি কি কাগজপাতির প্রয়োজন হয়
পারিবারিক সনদ আবেদনের জন্য সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু নথিপত্রের প্রয়োজন হয়।
এলাকাভেদে (যেমন: ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন) সামান্য কিছু পরিবর্তন হতে পারে, তবে মূলত নিচের কাগজগুলো অবশ্যই লাগবে:
- আবেদনকারীর এনআইডি (NID) কার্ডের কপি।
- পরিবারের সকল সদস্যের এনআইডি বা জন্ম সনদের কপি।
- আবেদনকারীর পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
- স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণস্বরূপ বিদ্যুৎ বিল বা হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদ।
পারিবারিক সনদ অনলাইন আবেদন করার নিয়ম
পারিবারিক সনদ সনদের জন্য আবেদন করার পদ্ধতি এখন অনেকটাই সহজ।
আপনি চাইলে সঠিক পোর্টালে গিয়ে ঘরে বসেই এটি করতে পারবেন।
এর অনলাইন আবেদন করার প্রক্রিয়াটি স্টেপ বাই স্টেপ দেখুন
১. ওয়েবসাইটে প্রবেশ
প্রথমে এই লিংকে https://lgoms.org/ যান। এখানে পারিবারিক সনদ থেকে আবেদনে ক্লিক করুন।
২. তথ্য পূরণ
প্রথমে গৃহকর্তার তথ্য থেকে গৃহকর্তার নাম, পিতা/স্বামীর নাম এবং মাতার নাম লিখতে হবে। এছাড়া গ্রাম,মোবাইল নম্বর দিতে হবে।
ঠিনাকা ও প্রশাসনিক এলাকা
এখান থেকে আপনার বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড নম্বর নির্বাচন করুন। এরপর ডাকঘর ও পোস্ট কোড দিন।
৩. পরিবার সদস্যের তথ্য প্রদান
এখানে 'সদস্য ০১', 'সদস্য ০২' এভাবে সিরিয়াল দেওয়া থাকবে।
প্রত্যেক সদস্যের ক্রমিক নম্বর, নাম, জন্মতারিখ, সম্পর্কে দিতে হবে।
আপনার সাথে তাদের সম্পর্ক (যেমন: পুত্র, কন্যা, স্ত্রী) নির্ভুলভাবে লিখুন।
৪. সাবমিট করা
এরপর সাবমিট বাটনে ক্লিক করতে হবে। ক্লিক করার পর সম্পূর্ণ ফর্মটি দেখা যাবে। এটি প্রিন্ট করে ডাউনলোড করে নিতে হবে।
৫. পরবর্তী করণীয়
অনলাইন আবেদন করার পর ওই প্রিন্ট কপি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ফটোকপি (সদস্যদের এনআইডি/জন্ম সনদ) নিয়ে আপনার ইউনিয়ন পরিষদ বা ওয়ার্ড কাউন্সিল অফিসে যোগাযোগ করুন।
চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলরের যাচাই-বাছাই শেষ হলে আপনি চূড়ান্ত সনদটি পেয়ে যাবেন।
এটা পেতে আপনার ৩ দিনের কম বা বেশি সময় লাগতে পারে।
তারা আপনাকে মোবাইলে এস এম এস দিয়ে জানাবে। অথবা আপনাকে খোঁজ রাখতে হবে।
আর কাগজপাতি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ফি দিতে হতে পারে। যা খুবই সামান্য।
গুরত্বপূর্ণ বিষয়
আবেদনের আগে আপনার ইউনিয়ন এই সিস্টেমের আওতায় আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে সাইটের ড্রপডাউন লিস্টে আপনার ইউনিয়নের নাম খুঁজে দেখুন।
যদি লিস্টে নাম থাকে, তবেই আপনি এই সাইট থেকে আবেদন করতে পারবেন।
খুব শীঘ্রই দেশের সকল জায়গায় এটি পরিপূর্ণভাবে চালু হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
১. পারিবারিক সনদ পেতে কত দিন সময় লাগে?
সাধারণত অনলাইনে আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা বা কাউন্সিল থেকে যাচাই-বাছাই করতে ৩ থেকে ৭ কার্যদিবস সময় লাগে।
২. অনলাইন আবেদনের ফি কত?
সরকারি ফি সাধারণত ৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। এর সাথে গেটওয়ে চার্জ (বিকাশ/নগদ ফি) হিসেবে ১০-২০ টাকা অতিরিক্ত যুক্ত হতে পারে।
এলাকাভেদে এই ফি কিছুটা কম-বেশি হয়।
৩. জন্ম নিবন্ধন দিয়ে কি পারিবারিক সনদ আবেদন করা যাবে?
হ্যাঁ, যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নেই, তারা ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন।
৪. আবেদন করার পর ভুল তথ্য দিলে কী করব?
আবেদন সাবমিট করার পর নিজে থেকে সংশোধন করা যায় না।
ভুল হলে আপনাকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার সচিবের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
৫. বিবাহিত মেয়েদের নাম কি বাবার পারিবারিক সনদে থাকবে?
অবশ্যই। উত্তরাধিকার বা পারিবারিক সনদে মৃত ব্যক্তির সকল সন্তান (ছেলে ও মেয়ে) এবং স্ত্রীর নাম থাকা আইনত বাধ্যতামূলক।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, পারিবারিক সনদ কেবল একটি কাগজ নয়।
এটি আপনার পরিবারের আইনি অধিকার নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
অনলাইনে আবেদনের সুবিধা চালু হওয়ায় এখন সাধারণ মানুষ কোনো ভোগান্তি ছাড়াই এই সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।
তবে মনে রাখবেন, অনলাইনে তথ্য দেওয়ার সময় প্রতিটি অক্ষর এবং নম্বর যেন এনআইডি বা জন্ম সনদ অনুযায়ী সঠিক হয়।
কারণ একটি ছোট ভুল ভবিষ্যতে বড় কোনো আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।
আশা করি, এই ব্লগে দেওয়া তথ্যগুলো আপনার আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।
আপনার পছন্দ হতে পারে এমন আরো পোস্ট


