অনলাইনে এখন খুব সহজেই ই পাসপোর্ট আবেদন করা যায়।
বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবছেন? কিংবা নিজের পরিচয়পত্রটিকে আরও আধুনিক ও নিরাপদ করতে চাচ্ছেন?
তাহলে আপনার জন্য প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো একটি ই-পাসপোর্ট (e-Passport) তৈরি করা।
একটা সময় ছিল যখন পাসপোর্ট মানেই ছিল দীর্ঘ লাইন, দালালের দৌড়ঝাঁপ আর মাসের পর মাস অপেক্ষা।
কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশের ছোঁয়ায় সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
বর্তমানে ঘরে বসেই স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে আপনি ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারেন।
চলুন, সহজ ধাপে জেনে নেওয়া যাক ই-পাসপোর্ট করার আদ্যোপান্ত।
ই-পাসপোর্ট হলো আধুনিক ও অত্যন্ত নিরাপদ ভ্রমণ দলিল, যার এমবেডেড মাইক্রোচিপ জালিয়াতি রোধ করে নাগরিকের পরিচয় ও তথ্যের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
দ্রুত ইমিগ্রেশন সুবিধা এবং আন্তর্জাতিকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে বর্তমান সময়ে বিদেশ ভ্রমণের জন্য ই-পাসপোর্ট করা অত্যন্ত জরুরি।
নিচে ই-পাসপোর্টের প্রয়োজনীয়তার প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
- সহজ ইমিগ্রেশন: ই-পাসপোর্ট থাকলে আপনি বিমানবন্দরে ই-গেট ব্যবহার করে খুব দ্রুত এবং কোনো লাইনে না দাঁড়িয়েই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পারবেন।
- নিরাপত্তা: এতে থাকা বায়োমেট্রিক তথ্য এবং ডিজিটাল চিপ পাসপোর্টের তথ্য চুরি বা নকল করা অসম্ভব করে তোলে।
- আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: বর্তমান বিশ্বে অধিকাংশ উন্নত দেশ ই-পাসপোর্টকে অধিক বিশ্বাসযোগ্য মনে করে, যা ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজতর করতে সাহায্য করে।
- দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা: ৫ বা ১০ বছর মেয়াদে করার সুযোগ থাকায় বারবার পাসপোর্ট নবায়নের ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
ই পাসপোর্ট করতে কি কি কাগজপাতি লাগে
ই-পাসপোর্ট আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র বা কাগজপাতির তালিকা নির্ভর করে আপনার বয়স এবং পেশার ওপর।
নিচে একটি পূর্ণাঙ্গ চেকলিস্ট দেওয়া হলো যা আপনাকে পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার আগে গুছিয়ে নিতে হবে:
- ব্যাংক বা অনলাইন মাধ্যমে ফি জমা দেওয়ার স্লিপ বা চালান
- জাতীয় পরিচয়পত্র NID এর মূল কপি এবং ফটোকপি। (১৮ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য বাধ্যতামূলক)
- ১৮ বছরের নিচে হলে অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ এবং পিতা-মাতার এনআইডি কার্ডের ফটোকপি।
- ৬ বছরের নিচে হলে ৩আর সাইজের ল্যাব প্রিন্ট করা ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা ছবি
- ১৮ থেকে ২০ বছর হলে এনআইডি অথবা অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ।
- বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল বা পানির বিলের কপি
- বিবাহিত হলে কাবিননামার কপি
অনলাইনে ই পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম
অনলাইনে ই-পাসপোর্ট আবেদন করার প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। আপনি যদি ধাপে ধাপে নিচের নিয়মগুলো অনুসরণ করেন, তবে কোনো দালালের সাহায্য ছাড়াই নিজে আবেদন করতে পারবেন।
ধাপ ১: অ্যাকাউন্ট তৈরি
১. প্রথমে এই লিংকে https://www.epassport.gov.bd/ যেতে হবে।
২. এখান থেকে Directly to online application বাটনে ক্লিক করতে হবে।
৩. এরপর এখান থেকে Are you applying from Bangladesh?-yes সিলেক্ট করতে হবে।
৪. Select District of your present address ও Select the police station nearest to your present address থেকে জেলা ও থানা সিলেক্ট করে continue বাটনে ক্লিক করতে হবে।
৫. এরপর আপনার ইমেইল দিয়ে continue বাটনে ক্লিক করতে হবে।
৬. এখান থেকে পাসওয়ার্ড, Full name, Surname, mobile number দিয়ে create account বাটনে ক্লিক করতে হবে।
৭. এরপর ইমেইলে একটি ভেরিফিকেশন লিংক পাওয়া যাবে।
সেখানে ক্লিক করে অ্যাকাউন্ট অ্যাক্টিভ করে নিতে হবে।
ধাপ ২: সাইন ইন করা
এখন sign in বাটনে ক্লিক করে email ও password দিয়ে sign in বাটনে ক্লিক করতে হবে।
ধাপ ৩: নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন
এখানে Apply for a new passport বাটনে ক্লিক করতে হবে।
- Passport type সেট করা
এরপর এখানে Passport type সিলেক্ট করতে হবে। সাধারণত এখানে ordinary passport সিলেক্ট করা হয়।
এরপর save and continue বাটনে ক্লিক করতে হবে।
- Personal information দেওয়া
এখান থেকে আপনার Personal information দিতে হবে।
এখানেI apply for myself এ টিক দিতে হবে,Gender দিতে হবে।
Full name, given name, surname, profession, religion, country code, mobile number, Date of birth, citizenship এ by birth দিতে হবে।
এরপর save and continue বাটনে ক্লিক করতে হবে।
- Address দেওয়া
Address থেকে District, city/village, post office, police station, present address একই থাকলে টিক দিতে হবে।
এরপর save and continue বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এখন ID documents থেকে nid নম্বর দিতে হবে।
এরপর আপনার আগে পাসপোর্ট ছিল কিনা, তা yes or no দিতে হবে। এরপর save and continue বাটনে ক্লিক করতে হবে।
- পিতামাতার তথ্য দেওয়া
এখানে Parental information থেকে Father name, profession, Nationality দিতে হবে। একইভাবে Mother information দিতে হবে। এরপর save and continue বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এরপর আপনার Spouse information থেকে বৈবাহিক অবস্থা দিতে হবে। আপনি যদি বিবাহিত হয়ে থাকেন তাহলে আপনার স্বামী বা স্ত্রীর তথ্য একইভাবে দিতে হবে।
Emergency contact থেকে যার সাথে যোগাযোগ করা যাবে সিলেক্ট করে, তার নাম, address, mobile number দিয়ে save and continue বাটনে ক্লিক করতে হবে।
ধাপ ৪: পাসপোর্টের ধরন ও মেয়াদ নির্বাচন
এখান থেকে দুই ধরনের পাসপোর্টের অপশন দেখাবে। যেমন- ৪৮/৬৪ পৃষ্ঠা। আবার মেয়াদ- ৫/১০ বছর।
এগুলি আপনাকে সিলেক্ট করে দিতে। এখানে প্রত্যেকটির মূল্য দেখাবে। এগুলি সিলেক্ট করে save and continue বাটনে ক্লিক করতে হবে।
ধাপ ৫: অ্যাপয়েন্টমেন্ট
এরপর Delivery options and appointment থেকে regular/express/super express সিলেক্ট করতে হবে।
express/super express সিলেক্ট করলে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়া যায়।
সেক্ষত্রে খরচ বেশি দিতে হয়।
এরপর আপনি যে তারিখে পাসপোর্ট অফিসে যাবেন, সেই তারিখ সিলেক্ট করে দিতে হবে।
তারপর save and continue বাটনে ক্লিক করতে হবে। এরপর অ্যাপলিকেশনটি দেখাবে।
ধাপ ৫: ফি প্রদান (Payment)
এরপর conset এ ক্লিক করে confirm and proceed to payment বাটনে ক্লিক করতে হবে।
আপনি চাইলে বিকাশ, রকেট বা কার্ডের মাধ্যমে অনলাইনে ফি জমা দিতে পারেন।
অথবা ‘Offline Payment’ সিলেক্ট করে ব্যাংক এশিয়া, ওয়ান ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকে গিয়ে টাকা জমা দিতে পারেন।
এরপর continue বাটনে ক্লিক করতে হবে।
ধাপ ৬: প্রিন্ট আউট
আবেদন সফলভাবে জমা হওয়ার পর Online Registration Form (তিন পৃষ্ঠার মূল ফরম) ডাউনলোড করে প্রিন্ট দিতে হবে। সেখানে নিজের স্বাক্ষর ও তারিখ দিতে হবে।
ধাপ ৭: পাসপোর্ট অফিসে যাওয়া
আবেদনের প্রিন্ট কপি, পেমেন্ট স্লিপ, প্রয়োজনীয় অর্জিনাল কপি ও ফটোকপি নিয়ে আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লটে যে সময় দেওয়া আছে সেই সময় অনুযায়ী পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে।
প্রথমেই আপনাকে নথিপত্র যাচাইয়ের লাইনে দাঁড়াতে হবে।
এখানে একজন কর্মকর্তা আপনার এনআইডি (NID), পেমেন্ট স্লিপ এবং আবেদনপত্রের তথ্যের সাথে অরিজিনাল কপির মিল আছে কি না তা দেখবেন।
সব ঠিক থাকলে তিনি আপনার ফরমে স্বাক্ষর বা সিল দিয়ে দেবেন।।
ধাপ ৮: বায়োমেট্রিক (ছবি, আঙুল ও চোখের ছাপ)
- কাগজ যাচাই শেষ হলে আপনাকে বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্টের জন্য পাঠানো হবে। এখানে সিরিয়াল অনুযায়ী আপনার ডাক পড়বে:
- আপনার ছবি তোলা হবে। (চশমা থাকলে খুলে ফেলতে হবে)।
- দুই হাতের দশ আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে।
- একটি মেশিনের দিকে তাকাতে হবে যা আপনার চোখের মণি স্ক্যান করবে।
- একটি প্যাডে আপনাকে ডিজিটাল স্বাক্ষর দিতে হবে।
ধাপ ৯: ডেলিভারি স্লিপ সংগ্রহ
বায়োমেট্রিক শেষ হওয়ার পর আপনাকে একটি ডেলিভারি স্লিপ (Delivery Slip) দেওয়া হবে।
এটি খুব যত্ন করে রাখবেন। পাসপোর্ট তৈরি হয়ে গেলে এই স্লিপটি দেখিয়েই আপনাকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।
ধাপ ১০: পাসপোর্ট সংগ্রহ
আপনার নম্বরে এস এম এস আসলে পাসপোর্ট অফিসে যেয়ে ডেলিভারি স্লিপ (Delivery Slip) দেখিয়ে পাসপোর্ট হাতে পাবেন।
ই পাসপোর্ট করতে কেমন খরচ হয়
ই-পাসপোর্টের খরচ মূলত নির্ভর করে আপনি কত পৃষ্ঠার পাসপোর্ট নিচ্ছেন, তার মেয়াদ কতদিন এবং কত দ্রুত সেটি হাতে পেতে চান তার ওপর।
২০২৬ সালের বর্তমান সরকারি ফি (১৫% ভ্যাটসহ) নিচে দেওয়া হলো:
| ডেলিভারির ধরন | ৪৮ পৃষ্ঠা (টাকা) | ৬৪ পৃষ্ঠা (টাকা) |
|---|---|---|
| ৫ বছর মেয়াদী ই-পাসপোর্ট ফি | ||
| সাধারণ (২১ দিন) | ৪,০২৫/- | ৬,৩২৫/- |
| জরুরি (৭-১০ দিন) | ৬,৩২৫/- | ৮,৬২৫/- |
| অতি জরুরি (২ দিন) | ৮,৬২৫/- | ১২,০৭৫/- |
| ১০ বছর মেয়াদী ই-পাসপোর্ট ফি | ||
| সাধারণ (২১ দিন) | ৫,৭৫০/- | ৮,০৫০/- |
| জরুরি (৭-১০ দিন) | ৮,০৫০/- | ১০,৩৫০/- |
| অতি জরুরি (২ দিন) | ১০,৩৫০/- | ১৩,৮০০/- |
ই পাসপোর্ট পেতে কতদিন লাগে
ই-পাসপোর্ট হাতে পেতে কতদিন সময় লাগবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনি আবেদনের সময় কোন ডেলিভারি মোড (Delivery Type) সিলেক্ট করেছেন তার ওপর।
২০২৬ সালের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী সময়সীমা নিচে দেওয়া হলো:
| আবেদনের ধরন | ডেলিভারির সময়সীমা | মন্তব্য |
|---|---|---|
| সাধারণ (Regular) | ১৫ থেকে ২১ কার্যদিবস | সরাসরি অফিস থেকে সংগ্রহ |
| জরুরি (Urgent) | ৭ থেকে ১০ কার্যদিবস | দ্রুততম সময়ে প্রসেসিং সম্পন্ন |
| অতি জরুরি (Super Express) | ২ কার্যদিবস | প্রিন্টিং ও ডেলিভারি দ্রুত সম্পন্ন |
FAQ: ই পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম
১. জন্মনিবন্ধন দিয়ে কি ১০ বছর মেয়াদী পাসপোর্ট করা যাবে?
না। ১০ বছর মেয়াদী পাসপোর্টের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকা বাধ্যতামূলক।
যাদের বয়স ১৮ বছরের কম এবং যারা জন্মনিবন্ধন দিয়ে আবেদন করছেন, তারা কেবল ৫ বছর মেয়াদী পাসপোর্ট পাবেন।
২. পাসপোর্ট ফি কি ক্যাশে জমা দেওয়া যায়?
না, সরাসরি ক্যাশ টাকা পাসপোর্ট অফিসে জমা নেওয়া হয় না।
আপনাকে নির্ধারিত ব্যাংকের শাখা (যেমন: সোনালী, ওয়ান, ট্রাস্ট ব্যাংক ইত্যাদি) অথবা অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের (বিকাশ, নগদ, কার্ড) মাধ্যমে ফি জমা দিতে হবে।
৩. পাসপোর্টের ছবি তোলার সময় কী ধরনের কাপড় পরা উচিত?
পাসপোর্টের ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা থাকে, তাই সাদা বা খুব হালকা রঙের পোশাক না পরাই ভালো।
গাঢ় রঙের (যেমন: নীল, কালো, মেরুন) পোশাক পরলে ছবি স্পষ্ট এবং সুন্দর আসে।
৪. ই-পাসপোর্ট করতে কতদিন সময় লাগে?
ডেলিভারির ধরণ অনুযায়ী সময় ভিন্ন হয়:
রেগুলার: ১৫ থেকে ২১ কার্যদিবস।
এক্সপ্রেস: ৭ থেকে ১০ কার্যদিবস।
সুপার এক্সপ্রেস: ২ কার্যদিবস
উপসংহার – ই পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম
পরিশেষে বলা যায়, ই-পাসপোর্ট কেবল একটি ভ্রমণ নথি নয়, বরং এটি আপনার ডিজিটাল পরিচয়ের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
দালালের খপ্পরে না পড়ে নিজে অনলাইনে আবেদন করলে যেমন অর্থ সাশ্রয় হয়, তেমনি তথ্যের নির্ভুলতাও নিশ্চিত থাকে।
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে ঘরে বসেই ফরম পূরণ এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি জমা দেওয়ার সুবিধা আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।
আপনার যদি জাতীয় পরিচয়পত্র বা অনলাইন জন্মনিবন্ধন থাকে, তবে দেরি না করে আজই ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করে ফেলুন।
এটি আপনার আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পথ সুগম করার পাশাপাশি দেশের ভেতরেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সুবিধা পেতে সাহায্য করবে।


