মৃত্যু সনদ অনলাইন আবেদন করার নিয়ম এখন অনেক সহজ।
জন্ম সনদের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি আমাদের অনেক সময় মৃত্যু সনদের প্রয়োজন পড়ে।
এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার নির্ধারণ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বণ্টন, ব্যাংক ও বিমা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এবং পারিবারিক পেনশন প্রাপ্তি সম্ভব হয়।
বর্তমান মৃত্যু সনদের জন্য আবেদন প্রক্রিয়াটি অনলাইন ভিত্তিক হওয়ায় এটি এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ ও দ্রুততর।
এই ব্লগে আমরা জানব, কিভাবে মৃত্যু সনদের জন্য অনলাইন আবেদন করতে হয়।
কিভাবে মৃত্যু সনদ সহজে পাওয়া যায় ও কি কি কাগজপাতি লাগে।
মৃত্যু সনদ বা ডেথ সার্টিফিকেট কেবল একটি কাগজ নয়, এটি একজন ব্যক্তির মৃত্যুর একটি আইনি দলিল।
নিচে মৃত্যু সনদের প্রধান প্রয়োজনীয়তাগুলো তুলে ধরা হলো:
১. উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির বণ্টন
মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া জমিজমা, বাড়ি বা অন্য কোনো স্থাবর সম্পত্তি আইন অনুযায়ী বন্টন করতে হলে মৃত্যু সনদ বাধ্যতামূলক।
২. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সঞ্চয়পত্র
মৃত ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নমিনির থাকা টাকা উত্তোলন করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রথমেই মৃত্যু সনদ দাখিল করতে বলে।
৩. পেনশন ও বিমা দাবি
মৃত ব্যক্তি যদি চাকরিজীবী হন, তবে তার পরিবারকে পেনশন বা গ্র্যাচুইটির সুবিধা পেতে এই সনদ জমা দিতে হয়। এ
ছাড়া জীবন বিমার (Life Insurance) টাকা দাবি করার ক্ষেত্রে এটিই প্রধান প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
৪. পারিবারিক পেনশন ও ভাতা
মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা সন্তানদের সরকারি বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা বা অন্য কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা পেতে মৃত্যু সনদের প্রয়োজন হয়।
৫. নামজারি ও রেকর্ড সংশোধন
পৈতৃক সম্পত্তি নিজের নামে নামজারি (Mutation) করতে বা সরকারি খতিয়ান থেকে মৃত ব্যক্তির নাম বাদ দিয়ে ওয়ারিশদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে এই সনদ প্রয়োজন।
৬. মামলা-মোকদ্দমা
কোনো আইনি লড়াই বা মামলা চলাকালীন বিবাদী বা বাদীর মৃত্যু হলে আদালতে এটি পেশ করতে হয়।
৭. পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব
মৃত ব্যক্তির পাসপোর্ট বাতিল করা বা ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য এই সনদ লাগে।
৮. পুনর্বিবাহ
স্ত্রী বা স্বামীর মৃত্যুর পর পুনরায় বিবাহের ক্ষেত্রে আইনি প্রমাণ হিসেবে এর প্রয়োজন হতে পারে।
মৃত্যু সনদের জন্য অনলাইন আবেদন এর জন্য কি কি কাগজপাতি লাগে
মৃত্যু সনদ অনলাইন আবেদন এর জন্য সাধারণত নিচের কাগজপত্রগুলো প্রয়োজন হয়।
যেসকল কাগজপাতির প্রয়োজন হয় তা হল-
১. মৃত ব্যক্তির জন্ম নিবন্ধন সনদ এর ফটোকপি
২. মৃত ব্যাক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এর ফটোকপি
৩. যদি হাসপাতালে মৃত্যু হয়, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত ডেথ সার্টিফিকেট।
৪. বাড়িতে মৃত্যু হলে কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসক (MBBS) কর্তৃক প্রদত্ত মৃত্যুর কারণ সংবলিত সনদ।
৫. যিনি আবেদন করছেন (সাধারণত সন্তান, স্বামী/স্ত্রী বা নিকটাত্মীয়) তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি।
৬. আবেদনকারীর ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি।
মৃত্যু সনদ অনলাইন আবেদন করার নিয়ম
নিচে ধাপে ধাপে আবেদনের নিয়মগুলো দেওয়া হলো:
ধাপ ১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ
এই লিংকে ক্লিক করে https://bdris.gov.bd/ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
এখানে ‘মৃত্যু নিবন্ধন’ থেকে ‘নতুন মৃত্যু নিবন্ধন আবেদনে’ ক্লিক করুন।
ধাপ ২: মৃত ব্যক্তির তথ্য যাচাই
মৃত ব্যক্তির ১৭ ডিজিটের ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন নম্বর এবং জন্ম তারিখ দিতে হবে।
এরপর ক্যাপচা টাইপ করে ‘অনুসন্ধান’ বাটনে ক্লিক করুন।
সঠিক তথ্য দেখালে ‘নির্বাচন করুন’ বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৩: নিবন্ধন কার্যালয়ের ঠিকানা প্রদান
‘নিবন্ধন কার্যালয়ের ঠিকানা’ সকল তথ্য দিয়ে ‘পরবর্তী’ বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৪: মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য প্রদান
এখানে মৃত্যুর তারিখ, মৃত্যুর কারণ, স্বামী/স্ত্রীর জন্ম নিবন্ধন নম্বর, স্বামী/স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, স্বামী/স্ত্রীর নাম বাংলা ও ইংরেজীতে দিন।
এরপর ‘পরবর্তী’ বাটনে ক্লিক করুন।
‘মৃত্যু স্থানের বিবরণ’ থেকে সকল তথ্য বাংলা ও ইংরেজীতে দিন।
এরপর ‘পরবর্তী’ বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৫: আবেদনকারীর তথ্য
এখানে তথ্য প্রদানকারী আবেদনকারীর ঘোষণা থেকে-
আমি সজ্ঞানে সপথ পূর্বক ঘোষণা করতেছি যে, তে টিক দিন।
আবেদনকারীর সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক, আবেদনকারীর জন্ম নিবন্ধন নম্বর, জন্ম তারিখ, জাতীয় পরিচয় পত্র নম্বর, আবেদনকারীর নাম, ফোন নম্বর, ইমেইল, মোবাইলে আসা ওটিপি দিন।
সংযোজন বাটনে ক্লিক করে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্রের কাগজের স্ক্যান/তোলা ছবি আপলোড করে দিন।
এরপর ‘সাবমিট’ বাটনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৬: আবেদন প্রিন্ট
এরপর success পেজ আসবে। সফলভাবে সাবমিট হলে আপনি একটি আবেদনপত্র নম্বর (Application ID) পাবেন।
পুরো আবেদন ফরমটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিন।
ধাপ ৭: কার্যালয়ে যোগাযোগ
প্রিন্ট করা ফরমটি নিয়ে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের (মৃত ব্যক্তির NID, জন্ম সনদ, চিকিৎসকের প্রত্যয়ন, আবেদন কারীর NID, আবেদনকারীর জন্ম সনদ) ফটোকপি সংযুক্ত করে ১৫ দিনের মধ্যে আপনার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা কাউন্সিলর অফিসে সশরীরে জমা দিন।
এরপর আপনার মৃত্যু সনদ রেডি হয়ে গেলে আপনাকে ফোন কলে জানিয়ে দেওয়া হবে।
FAQ: মৃত্যু সনদ অনলাইন আবেদন
১. মৃত ব্যক্তির ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন না থাকলে কি মৃত্যু সনদ পাওয়া যাবে?
না। বর্তমানে অনলাইন সিস্টেমে মৃত্যু সনদের আবেদন করতে হলে মৃত ব্যক্তির ১৭ ডিজিটের ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন নম্বর থাকা বাধ্যতামূলক।
২. মৃত্যুর কতদিন পর পর্যন্ত ফ্রিতে আবেদন করা যায়?
মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে আবেদন করলে কোনো সরকারি ফি লাগে না।
এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। ৪৫ দিন পার হয়ে গেলে বিলম্ব ফি প্রযোজ্য হয়।
৩. আবেদন কি যে কেউ করতে পারে?
সাধারণত মৃত ব্যক্তির নিকটাত্মীয় (সন্তান, স্বামী/স্ত্রী, নাতি-নাতনি) আবেদনকারী হিসেবে তথ্য প্রদান করেন।
৪. কতদিন পর মৃত্যু সনদ হাতে পাওয়া যায়?
কার্যালয়ে কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর সাধারণত ৩ থেকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে সনদ প্রদান করা হয়।
তবে এটি সংশ্লিষ্ট অফিসের কাজের চাপের ওপর নির্ভর করে।
উপসংহার – মৃত্যু সনদ অনলাইন আবেদন
বর্তমান ডিজিটাল যুগে মৃত্যু সনদের জন্য অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ হয়ে গেছে।
সঠিক সময়ে নির্ভুল তথ্য দিয়ে মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করলে সম্পত্তির উত্তরাধিকার, ব্যাংক-বিমা এবং পারিবারিক পেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো অত্যন্ত সহজ ও দ্রুততর হয়।
তাই শোকের ছায়ায় আচ্ছন্ন থাকলেও, পরিবারের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে সময়মতো এই সনদটি সংগ্রহ করা উচিত।
আশা করি এই ব্লগটি পড়ে আপনারা খুব সহজেই এই সনদটি অনলাইন থেকে উত্তোলন করতে পারবেন।
আপনার পছন্দ হতে পারে এমন আরো পোস্ট


