আমাদের অনেক সময় ওয়ারিশ সনদ অনলাইন আবেদন করার প্রয়োজন পড়ে।

পরিবারের কোনো নিকটাত্মীয় বা অভিভাবকের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সঠিক ও আইনানুগভাবে বণ্টন করার জন্য ওয়ারিশ সনদের প্রয়োজন হয়।

একটা সময় ছিল যখন এই সনদ পাওয়ার জন্য মাসের পর মাস ইউনিয়ন পরিষদ বা সরকারি দপ্তরে ঘুরতে হতো।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল।

এখন আপনি নিজের ঘরে বসেই স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে খুব সহজেই ওয়ারিশ সনদের জন্য অনলাইন আবেদন করতে পারেন।

এতে যেমন সময়ের সাশ্রয় হয়, তেমনি স্বচ্ছতাও বজায় থাকে।

এই ব্লগের মাধ্যমে অনলাইনে ওয়ারিশ সনদ আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারবেন।

একটি ওয়ারিশ সনদ বা উত্তরাধিকার সনদ কেবল একটি সাধারণ কাগজ নয়।

এটি মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের আইনগত পরিচিতি এবং অধিকারের প্রধান দলিল। এর গুরুত্ব নিচে তুলে ধরা হলো:

১. জমি বা স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর

মৃত ব্যক্তির নামে থাকা জমি নিজের নামে নামজারি (Mutation) করতে বা সেই জমি বিক্রি করতে গেলে ওয়ারিশ সনদ থাকা বাধ্যতামূলক।

ওয়ারিশ সনদ অনলাইন আবেদন

২. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সঞ্চয়পত্রের টাকা উত্তোলন

মৃত ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা, ডিপিএস বা সঞ্চয়পত্রের নমিনি না থাকলে অথবা নমিনি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক সকল ওয়ারিশের সম্মতির প্রমাণ হিসেবে এই সনদ দাবি করে।

৩. সরকারি অনুদান ও ভাতা:

মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ভাতা বা সরকারি কোনো বিমা ও পেনশনের সুবিধা পেতে হলে ওয়ারিশ সনদের প্রয়োজন হয়।

৪. বিদেশে গমন ও উচ্চশিক্ষা

অনেক সময় স্পনসরশিপ বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অর্থের উৎস দেখাতে বিদেশে এই সনদটি লিগ্যাল ডকুমেন্ট হিসেবে প্রয়োজন হয়।

৫. কোম্পানি শেয়ার বা শেয়ার বাজার

মৃত ব্যক্তি যদি কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হয়ে থাকেন, তবে সেই শেয়ার উত্তরাধিকারীদের নামে ট্রান্সফার করতে এই সনদ লাগে।

ওয়ারিশ সনদ অনলাইন আবেদন এর জন্য কি কি কাগজপাতি প্রয়োজন

অনলাইনে ওয়ারিশ সনদের আবেদনের জন্য সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা জরুরি।

কারণ আবেদন করার সময় এগুলো স্ক্যান কপি বা ছবি হিসেবে আপলোড করতে হয়।

নিচে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের একটি তালিকা দেওয়া হলো:

১. মৃত ব্যক্তির ডিজিটাল মৃত্যু সনদ

২. মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)

৩. আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)

৪. আবেদনকারীরএক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি

৫. সকল ওয়ারিশের এনআইডি কার্ড বা জন্ম নিবন্ধনের কপি

৬.মৃত ব্যক্তির সাথে সকল ওয়ারিশের সম্পর্কের প্রমাণ

৭. সকল ওয়ারিশের মোবাইল নম্বর

ওয়ারিশ সনদ অনলাইন আবেদন করার নিয়ম

আপনি যদি ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা এলাকার বাসিন্দা হন, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে নিজেই আবেদন করতে পারবেন।

অনলাইনে ওয়ারিশ সনদ আবেদন করার সহজ ধাপসমূহ-

১. সঠিক ওয়েবসাইটে প্রবেশ

প্রথমে https://lgoms.org/ এই লিংকে প্রবেশ করুন। এখান থেকে ওয়ারিশ সনদ থেকে আবেদন বাটনে ক্লিক করুন।

২. ওয়ারিশ সনদের আবেদন

এখানে একটি ফর্ম দেখতে পাবেন। ফর্মে মৃত ব্যক্তির তথ্য (সনদটি ইংরেজীতে চাইলে সকল তথ্য ইংরেজীতে পূরন করুন)।

যেমন- গৃহকর্তার নাম, পিতা/স্বামী, মাতার নাম,গ্রাম, মোবাইল নম্বর এগুলি পূরণ করুন।

ঠিকানা ও প্রশাসনিক এলাকা থেকে বিভাগ,জেলা, উপজেলা ইত্যাদি সিলেক্ট করুন।

পরিবার সদস্যের তথ্য থেকে মৃত ব্যক্তির পরিবারে যতজন আছেন।

যেমন স্বামী/স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ইত্যাদি সকল সদস্যের আলাদা আলাদা ভাবে ক্রমিক নং, Name, জন্ম তারিখ, সম্পর্ক দিন। এরপর সাবমিট বাটনে ক্লিক করুন।

৩. ফর্ম ডাউনলোড ও প্রিন্ট

আপনি সম্পুর্ণ ওয়ারিশ সনদ আবেদন ফর্মটি দেখতে পাবেন। ফর্মটি ডাউনলোড করতে হবে ও প্রিন্ট করতে হবে।

এরপর ফর্মে থাকা ২ জন গন্যমান্য ব্যক্রির স্বাক্ষরের ঘরে তাদের স্বাক্ষর নিতে হবে।

আবেদনকারীর ১ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি ফর্মে ছবির
ঘরে যোগ করে দিতে হবে।

৪. ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় বা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে যাওয়া

ফর্মটির সাথে মৃত ব্যক্তির ডিজিটাল মৃত্যু সনদ এর ফটোকপি, মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, সকল ওয়ারিশের পরিচয়পত্র এর ফটোকপি ইত্যাদি সকল প্রয়োজনীয় কাগজ যুক্ত করে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় বা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে যেতে হবে।

সেখানে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা ফি দিয়ে, ফি এর কাগজ যোগ করে দিতে হবে।

সকল কাগজপত্র জমা দিতে হবে। এরপর নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে।

এছাড়া আবেদনের সময় একটি ট্রাকিং লিংক পাবেন। সেখান থেকেও অবস্থা জেনে নিতে পারবেন।

আপনার আবেদনটি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ সচিব বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিস থেকে যাচাই করা হবে।

তদন্ত শেষে আবেদনটি অনুমোদিত হলে আপনার মোবাইলে এসএমএস আসবে।

এরপর আপনি পোর্টাল থেকে ডিজিটাল সনদটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিতে পারবেন অথবা সরাসরি অফিস থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন।

FAQ: ওয়ারিশ সনদ অনলাইন আবেদন

১. আবেদন করার কতদিন পর সনদ পাওয়া যায়?

তথ্য সঠিক থাকলে এবং চেয়ারম্যান/কাউন্সিলর অফিস থেকে যাচাই সম্পন্ন হলে সাধারণত ৩ থেকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে ডিজিটাল সনদটি ইস্যু করা হয়।

২. ডিজিটাল ওয়ারিশ সনদ কি জালিয়াতি করা সম্ভব?

না। ডিজিটাল সনদে একটি ইউনিক QR Code থাকে।

যেকোনো স্মার্টফোন দিয়ে এই কোড স্ক্যান করলে সরাসরি সরকারি সার্ভার থেকে তথ্য যাচাই করা যায়, তাই এটি জাল করা অসম্ভব।

৩. অনলাইন ওয়ারিশ সনদের জন্য কি কোন টাকা ফি দিতে হয়?

হ্যাঁ নির্দিষ্ট ফি বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে দিতে হয়।

৪. আবেদন অনুমোদন হয়েছে কি না তা কীভাবে বুঝবো?

আবেদন করার সময় আপনি যে মোবাইল নম্বরটি দিয়েছেন, তাতে এসএমএস-এর মাধ্যমে আপডেট জানানো হবে।

এছাড়া আপনি আপনার Tracking ID দিয়ে ওয়েবসাইটে গিয়েও আবেদনের বর্তমান অবস্থা চেক করতে পারবেন।

উপসংহার – ওয়ারিশ সনদ অনলাইন আবেদন

এখন ভোগান্তি ছাড়াই ওয়ারিশ সনদের জন্য অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।

দালালের পেছনে না ঘুরে বা বারবার ইউনিয়ন পরিষদে না গিয়ে আপনি নিজের ঘরে বসেই এই গুরুত্বপূর্ণ দলিলটি সংগ্রহ করতে পারবেন।

এর ফলে যেমন সময়ের সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি সরকারি সেবাগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে।

মনে রাখবেন, ওয়ারিশ সনদ খুবই গুরত্বপূর্ণ একটি দলিল।

এটি আপনার ও আপনার পরিবারের আইনি অধিকারের রক্ষাকবচ।

তাই দেরি না করে আজই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে সংশ্লিষ্ট পোর্টালে আবেদনটি সেরে ফেলুন।