অনলাইনে ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন এখন খুবই সহজ একটি প্রক্রিয়া।

যেকেউ চাইলেই ঘরে বসে অনলাইনের মাধ্যমে ভোটার আইডি কার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা ভুল সংশোধন করতে পারেন।

একটা সময় ছিল যখন এনআইডি কার্ডের তথ্য সংশোধন মানেই ছিল সরকারি দপ্তরে দীর্ঘ লাইন আর মাসের পর মাস অপেক্ষা।

কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে এখন সেই ভোগান্তি কমে গেছে।

এখন আপনি আপনার হাতের স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে ঘরে বসেই অনলাইনে ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন করতে পারেন।

আজকের এই ব্লগে আপনারা জানতে পারবেন কীভাবে খুব সহজে, সঠিক নিয়মে আপনি আপনার এনআইডিতে থাকা ভুল সংশোধন করতে পারবেন।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাংকিং, পাসপোর্ট তৈরি, সিম কার্ড ক্রয় থেকে শুরু করে সরকারি যেকোনো সুবিধা পেতে জাতীয় পরিচয়পত্র বা NID একটি অপরিহার্য দলিল।

কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, অসাবধানতাবশত এই কার্ডে নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম কিংবা জন্ম তারিখে ভুল থেকে যায়।

এছাড়া অনেক সময় এলাকার পরিবর্তন করার প্রয়োজন পড়ে। একটি ছোট ভুলও অনেক সময় বড় ধরণের বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই ভুল গুলি শুধরিয়ে ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন করা উচিত।

অনলাইনে ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন

কেননা, এই সংশোধন না করার ফলে ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনে জটিলতা, পাসপোর্ট তৈরি ও বিদেশ গমনে, সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা পেতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

এমনকি চাকরির আবেদন ও জয়েনিং, জমি কেনাবেচা ও রেজিস্ট্রেশন, সিম কার্ড ও ইউটিলিটি কানেকশন ইত্যাদিতেও সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়।

তাই অবশ্যই এন আইডিতে ভুল থাকলে তা সংশোধন করা জরুরী।

অনলাইনে ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন করতে কি কি লাগে?

অনলাইনে ভোটার আইডি কার্ড (NID) সংশোধনের ক্ষেত্রে তথ্যের ধরণ অনুযায়ী বিভিন্ন ডকুমেন্টের প্রয়োজন হয়।

অর্থাৎ ভিন্ন ভিন্ন বিষয় সংশোধনের জন্য ভিন্ন কাগজপাতির প্রয়োজন হয়। সকল কাগজের স্ক্যান কপি আপনাকে রাখতে হবে।

আর আপনাকে অবশ্যই লির্ভুল কাগজ সাবমিট করতে হবে।

কি কি সমস্যায় কিকি ডমুমেন্ট লাগে তা এই লিংক থেকে জানতে পারবেন। –

https://www.nidw.gov.bd/LawsRulesNIDCorrection.php.

এছাড়া আপনার ফেস ভেরিফিকেশনের জন্য NID Wallet App টি মোবাইলে ইন্সটল করতে হবে।

অনলাইনে ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন পদ্ধতি

আপনি আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে সংশোধনের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

সঠিক কাগজপত্র ও তথ্য দিয়ে আবেদন করলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়।

তাই অফিসে না গিয়ে ঘরে বসেই এখন নিরাপদে আপনার NID তথ্য আপডেট করতে পারেন।

ধাপে ধাপে অনলাইনে এন আইডি সংশোধন করার পদ্ধতি দেখুন-

ধাপ ১: রেজিস্ট্রেশন ও লগইন

প্রথমে https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/ এই লিংকে যেতে হবে।

এখান থেকে রেজিস্টার করুন বাটনে ক্লিক করতে হবে। এখানে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্ম তারিখ এবং ক্যাপচা কোড দিয়ে সাবমিট বাটনে ক্লিক করতে হবে।

এরপর অ্যাকাউন্ট রেজিস্টার পেজ থেকে বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার বিভাগ, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন করে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করতে হবে।

আপনার ইমেইল বা মোবাইল এর মাধ্যমে ভেরিফিকেশনের জন্য যেকোন একটি দিয়ে ওটিপি পাঠান বাটনে ক্লিক করতে হবে।

এক্ষেত্রে আপনার মোবাইল দিয়ে ভেরিফিকেশন করা সবথেকে ভালো হবে।

আপনার নম্বরে পাওয়া ৬ ডিজিটের কোডটি বসিয়ে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করতে হবে।

ধাপ ২: ফেস ভেরিফিকেশন (NID Wallet)

নিরাপত্তার স্বার্থে আপনার চেহারা যাচাই করা হবে।

আপনার মোবাইলে ‘NID Wallet‘ অ্যাপটি গুগল প্লেস্টোর থেকে ডাউনলোড করে নিতে হবে। এরপর QR স্ক্যান করে নিতে হবে।

স্ক্যান করে Start Face scan বাটনে ক্লিক করতে হবে।

এরপর মোবাইলের ক্যামেরার সামনে আপনার মুখমণ্ডল ডানে-বামে ও সোজাসুজি ঘুরিয়ে ভেরিফিকেশন শেষ করতে হবে।

ধাপ ৩: তথ্য এডিট বা সংশোধন

তারপর আপনার আগের ওয়েবপেজ থেকে দেখতে পাবেন, আপনি লগিন হয়ে গেছেন। এরপর এড়িয়ে যান বাটনে ক্লিক করতে হবে।

এরপর প্রোফাইল বাটনে ক্লিক করতে হবে।

বাটনে ক্লিক করে এডিট বাটনে ক্লিক করতে হবে। তারপর বহাল বাটনে ক্লিক করতে হবে।

এরপর আপনার যে তথ্যটি ভুল আছে, তা সঠিক করে নিতে হবে।

যেমন- নাম, লিঙ্গ, রক্তের গ্রুপ, জন্ম তারিখ, জন্ম স্থান,পিতার তথ্য,মাতার তথ্য, বৈবাহিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ইত্যাদি সংশোধন করতে পারবেন। হয়ে গেল পরবর্তী বাটনে ক্লিক করতে হবে।

এরপর এই পেজে আপনি আপডেট করা তথ্য দেখতে পাবেন।

তারপর পরবর্তী বাটনে ক্লিক করতে হবে।

ধাপ ৪: ফি প্রদান

আপনার তথ্য পরিবর্তনের জন্য কত টাকা লাগবে,তা দেখা যাবে।

এরপর আপনি যদি বিকাশ থেকে পেমেন্ট করতে চান, তাহলে বিকাশের অ্যাপে যেয়ে পে বিল বাটনে ক্লিক করতে হবে।

এখানে সার্চ বার থেকে nid service লিখে সার্চ করতে হবে।

তারপর এখান থেকে Nid servcie এ ক্লিক করতে হবে।

আপনি যে ধরনের পরিবর্তন চান,তা সিলেক্ট করে দিতে হবে।

এরপর আপনার NID নম্বর দিতে হবে।

পে বিল করার জন্য এগিয়ে যান বাটনে ক্লিক করতে হবে।

আপনার নির্ধারিত ফি আপনি দেখতে পারবেন। এটি ২৩০ থেকে ৩৪৫ টাকা বা তার বেশি হতে পারে।

এরপর পরের ধাপে যেতে ট্যাপ করুন বাটনে ক্লিক করতে হবে। এখানে আপনার বিকাশের পিন দিয়ে পেমেন্ট করে দিতে হবে।

ধাপ ৫: ডকুমেন্ট আপলোড

ফি প্রদান শেষে আপনার পুনরায় আগের পেজে যেতে হবে। সেখান থেকে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করতে হবে।

এখান থেকে আপনার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজের স্ক্যান করা ছবি আপলোড করতে হবে।

যেমন- এস.এসসি/সমমান সনদ, নাগরিকত্ব সনদ, জন্ম সনদ, পাসপোর্ট, পিতা/স্বামী/মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, জন্ম সনদ ইত্যাদি।

কোন পরিবর্তনের জন্য কোন কাগজ আপলোড করতে হবে,তা জানতে এই লিংকে ক্লিক করুন

https://www.nidw.gov.bd/LawsRulesNIDCorrection.php

এরপর পরবর্তী বাটনে ক্লিক করতে হবে।

এখান থেকে আপনার সংশোধিত ও ডকুমেন্ট গুলি দেখতে পাবেন। এরপর সাবমিট বাটনে ক্লিক করতে হবে।

ধাপ ৬: আবেদন জমা ও কনফার্মেশন

আপনার প্রোফাইল সেকশন থেকে দেখতে পাবেন, আপনার একটি অ্যাপ্লিকেশন পেন্ডিং রয়েছে এই ম্যাসেজ।

এখান থেকে ডাউনলোড বাটনে ক্লিক করে অ্যাপ্লিকেশন কপি ডাউনলোড করে নিবেন।

এরপর আপনাকে কমপক্ষে ১৫ কার্যদিবস অপেক্ষা করতে হবে। এর বেশিও হতে পারে।

আপনার আবেদন যাচাই বাচাই শেষে সেটি অনুমোদিত হলে,

আপনার মোবাইলে একটি sms আসবে। যদি sms না পেয়ে থাকেন, তাহলে নির্বাচন অফিসে যেয়ে যোগাযোগ করতে পারেন।

তারা আপনাকে জানাতে পারবে আপনার আবেদনটি কোন পর্যায়ে আছে।

আপনার তথ্য পরিবর্তন হলে, আপনি পোর্টালে যেয়ে সংশোধিত কার্ডটি দেখতে পাবেন। চাইলে সেটি ডাউনলোড করে ও প্রিন্ট করে নিতে পারেন,

অনলাইনে ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন এর ক্ষেত্রে সতর্কতা

এনআইডি সংশোধন খুব মনোযোগের সহিত করতে হবে।। আবেদন করার সময় নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই মাথায় রাখবেন:

১. সঠিক তথ্য ও বানান যাচাই

আবেদন সাবমিট করার আগে বারবার চেক করুন আপনি যে নতুন তথ্যটি (নামের বানান বা জন্ম তারিখ) দিচ্ছেন, তা আপনার সার্টিফিকেট বা জন্ম নিবন্ধনের সাথে হুবহু মিল আছে কি না।

একটি অক্ষরের ভুলও আপনার আবেদনটি বাতিল করতে পারে।

২. ডকুমেন্টের স্পষ্টতা

যেসব কাগজপত্র (যেমন: SSC সার্টিফিকেট বা নিকাহনামা) আপলোড করবেন, সেগুলো যেন খুব পরিষ্কার এবং পড়ার যোগ্য হয়।

ঝাপসা বা অন্ধকার ছবি আপলোড করলে নির্বাচন কমিশন তা প্রত্যাখ্যান করবে। প্রয়োজনে স্ক্যানার ব্যবহার করে স্ক্যান করে নিন।

৩. জন্ম নিবন্ধনের ধরন

মনে রাখবেন, এনআইডি সংশোধনের জন্য আপনার জন্ম নিবন্ধন সনদটি অবশ্যই অনলাইন ভেরিফাইড (১৭ ডিজিটের) হতে হবে।

হাতে লেখা বা এনালগ জন্ম নিবন্ধন এখন আর গ্রহণ করা হয় না।

৪. একই সাথে একাধিক আবেদন এড়িয়ে চলুন

একসাথে অনেকগুলো বড় ধরণের তথ্য (যেমন: নিজের নাম, বাবার নাম এবং জন্ম তারিখ সব একসাথে) পরিবর্তন করতে চাইলে আবেদনটি ‘ক’ ক্যাটাগরি থেকে বড় ক্যাটাগরিতে চলে যেতে পারে, যা অনুমোদিত হতে অনেক সময় লাগে।

খুব জরুরি না হলে ধাপে ধাপে সংশোধন করা ভালো।

৫. দালালের খপ্পর থেকে সাবধান

অনলাইনে এনআইডি সংশোধন একটি সরকারি এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া।

কোনো তৃতীয় পক্ষ বা দালালের মাধ্যমে টাকা দিয়ে দ্রুত করানোর চেষ্টা করবেন না।

এতে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঝুঁকি থাকে এবং ভুয়া কাগজপত্রের কারণে আপনার স্থায়ী এনআইডি ব্লক হয়ে যেতে পারে।

FAQ: অনলাইনে ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন

১. অনলাইনে এনআইডি সংশোধন করতে কত দিন সময় লাগে?

সাধারণত আবেদনের ধরণ এবং ক্যাটাগরি অনুযায়ী ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবস সময় লাগে।

২. আমি কি আমার এনআইডি কার্ডের ছবি পরিবর্তন করতে পারি?

হ্যাঁ, ছবি পরিবর্তন করা সম্ভব। তবে এটি সাধারণ তথ্য সংশোধনের মতো শুধু অনলাইনে হয় না।

আপনাকে অনলাইনে আবেদন করে ফি জমা দেওয়ার পর সশরীরে আপনার নিকটস্থ উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়ে নতুন করে ছবি তুলতে হবে।

৩. এনআইডি সংশোধনের ফি কত এবং কীভাবে দেব?

ব্যক্তিগত তথ্য সংশোধনের জন্য সাধারণ ফি সাধারণত ২৩০ টাকা (ভ্যাটসহ)।

আপনি আপনার মোবাইল থেকে বিকাশ, রকেট বা উপায় অ্যাপের ‘Bill Pay’ অপশনে গিয়ে ‘NID Service’ সিলেক্ট করে এই ফি জমা দিতে পারেন।

৪. সংশোধিত আইডি কার্ডটি আমি কীভাবে হাতে পাব?

আপনার আবেদনটি অনুমোদিত হওয়ার পর আপনি এনআইডি পোর্টাল থেকে আপনার সংশোধিত ডিজিটাল কপি টি ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।

এটি লেমিনেটিং করে সব কাজে ব্যবহার করা যায়। পরবর্তীতে স্মার্ট কার্ড বিতরণ শুরু হলে আপনি মূল কার্ডটি সংগ্রহ করতে পারবেন।

উপসংহার – অনলাইনে ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন

পরিশেষে বলা যায়, জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি (NID) কার্ডের তথ্য সংশোধন এখন আর আগের মতো জটিল বা সময়সাপেক্ষ কোনো বিষয় নয়।

ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে আমরা এখন ঘরে বসেই নিজেদের ভুলগুলো অনলাইনের মাধ্যমে ঠিক করে নিতে পারছি।

সঠিক কাগজপত্র এবং সঠিক নিয়ম অনুসরণ করলে আপনি খুব সহজেই আপনার এনআইডি কার্ডটি হালনাগাদ করে নিতে পারেন।

মনে রাখবেন, একটি নির্ভুল এনআইডি কার্ড আপনার নাগরিক অধিকারের প্রধান চাবিকাঠি।

তাই ছোট কোনো ভুল থাকলেও তা অবহেলা না করে দ্রুত সংশোধন করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

এতে ভবিষ্যতে পাসপোর্ট করা, ব্যাংক একাউন্ট খোলা বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন