অনলাইনে জিডি করার নিয়ম জানা থাকলে ঘরে বসেই সহজে সাধারণ ডায়েরি করা যায়।

আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আর থানায় গিয়ে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হয় না।

শুধুমাত্র একটি স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করেই এই আইনি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা সম্ভব।

জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নিজস্ব মোবাইল নম্বরের সাহায্যে যে কেউ এটি করতে পারেন।

এটি সাধারণ মানুষের মূল্যবান সময় এবং যাতায়াত খরচ বাঁচিয়ে দেয়।

যেকোনো সমস্যার সমাধানে দ্রুত পুলিশ প্রশাসনকে জানাতে এটি অত্যন্ত কার্যকর।

এই ব্লগে আমরা জানবো কীভাবে খুব সহজে অনলাইনে জিডি করা যায়, এতে কি কি সুবিধা, কোন কোন সমস্যায় এটি করা যায় এবং এর জন্য কী কী প্রয়োজন।

Online GD (অনলাইন জিডি) (Online General Diary) হলো ঘরে বসে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে থানায় সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করার একটি সরকারি ব্যবস্থা।

অনলাইনে জিডি করার নিয়ম

সহজ কথায়, কোনো জরুরি জিনিস (যেমন: মোবাইল, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সার্টিফিকেট বা মূল্যবান নথি) হারিয়ে গেলে বা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার বিষয়ে অভিযোগ করতে থানায় না যেয়ে ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ ডায়েরি করাকে অনলাইন জিডি বলে।

এটি বর্তমানে বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে।

কি কি সমস্যায় অনলাইনে জিডি করা যায়?

আজকাল নানা ধরনের সমস্যায় থানায় না যেয়ে অনলাইনে জিডি করা যায়।

তাই আমাদের অনলাইনে জিডি করার নিয়ম জানতে হবে।

যেসকল সমস্যায় অনলাইনে জিডি করা যায় তা হল-

১. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জন্ম নিবন্ধন সনদ, স্মার্ট কার্ড ইত্যাদি হারিয়ে গেলে।

২. এসএসসি/এইচএসসি বা যেকোনো পরীক্ষার সার্টিফিকেট, মার্কশিট, অ্যাডমিট কার্ড বা রেজিস্ট্রেশন কার্ড হারিয়ে গেলে।

৩. জমির মূল খতিয়ান, পর্চা, বায়না দলিল, ফ্ল্যাটের কাগজ বা অন্যান্য আইনি চুক্তিপত্র হারিয়ে গেলে।

৪. মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা ডেস্কটপ কম্পিউটার, ক্যামেরা, হাতঘড়ি বা অন্যান্য দামি গ্যাজেট হারিয়ে গেলে।

৫. মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার বা অন্য যেকোনো গাড়ি হারালে।

৬. কোনো ব্যক্তি বা শিশু নিখোঁজ বা হারিয়ে গেলে।

৭. নিজের কোনো গৃহপালিত পশু-পাখি হারিয়ে গেলে বা অন্যের কোনো পশু-পাখি খুঁজে পেলে।

৮. নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার বা মূল্যবান কোনো জিনিসপত্র হারিয়ে গেলে বা কুড়িয়ে পেলে।

৯. জানমালের সাধারণ কোনো ক্ষতির আশঙ্কা বা নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে।

কোন কোন বিষয়ে অনলাইনে জিডি করা যাবে না?

১. যেকোনো ধরনের মারামারি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বা খুন সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে (এগুলো সরাসরি মামলার বিষয়)।

২. জমিজমা সংক্রান্ত জটিল বিরোধ বা মারামারি।

৩. সাইবার ক্রাইম, ব্লাকমেইল বা গুরুতর কোনো অপরাধের লিখিত অভিযোগ।

অনলাইন জিডি করতে কী কী লাগবে?

আপনার অনলাইনে জিডি করার নিয়ম জানার আগে জানতে হবে, এটি করতে কি কি লাগবে।

যা যা লাগবে-

১. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card) নম্বর।

২. জাতীয় পরিচয়পত্রে ব্যবহৃত সঠিক জন্মতারিখ।

৩. আপনার নামে নিবন্ধিত একটি সচল মোবাইল নম্বর (যাতে ওটিপি বা ভেরিফিকেশন কোড আসবে)।

৪. একটি লাইভ ছবি (মোবাইল বা কম্পিউটারের ক্যামেরার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে নিতে হবে)।

অনলাইনে জিডি করার নিয়ম ধাপে ধাপে

অনলাইনের মাধ্যমে জিডি করার নিয়মগুলি দেখুন-

ধাপ ১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ ও অ্যাপ ডাউনলোড

আপনার ব্রাউজার থেকে gd.police.gov.bd লিংকে প্রবেশ করুন।

নিচে থেকে Get it on Google Play বাটনে ক্লিক করে Online GD অ্যাপটি ইন্সটল করুন।

ধাপ ২: অ্যাকাউন্ট নিবন্ধন (Registration)

অ্যাপটি ইন্সটল করে ওপেন করে মোবাইলের Location অন করে দিতে হবে।

এরপর নিবন্ধন বাটনে ক্লিক করুন।

এখান থেকে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করুন।

এরপর আপনার মোবাইল নম্বর, ওটিপি, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ,নাম, পিতার নাম, মাতার নাম দিয়ে পরিচয়পত্র যাচাই বাটনে ক্লিক করতে হবে।

তথ্য সঠিক হলে ‘এখানে ক্লিক করুন’, বাটনে ক্লিক করুন।

এরপর ক্যামেরা ওপেন হয়ে আপনার ফেস ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন।

এবার তথ্য থেকে বিভাগ, জেলা, থানা, ইউনিয়ন, গ্রাম, পোস্ট কোড দিয়ে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করুন।

এরপর স্বাক্ষর দিয়ে ‘সংরক্ষণ বাটনে’ ক্লিক করুন।

এবার আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস, পাসওয়ার্ড ২ বার দিয়ে এখানে ক্লিক করে ‘একাউন্ট তৈরি করুন’, বাটনে ক্লিক করতে হবে।

ধাপ ৩: লগইন এবং জিডির আবেদন

‘প্রবেশ করুন’ বাটনে ক্লিক করে মোবাইল ও পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রবেশ করুন বাটনে ক্লিক করুন।

জিডির আবেদন করার জন্য ড্যাশবোর্ড থেকে অন্যান্য আবেদন অপশনে ক্লিক করুন।

এখান থেকে আবেদনের ধরন নির্বাচন করুন, এরপর বিবরণ লিখে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করুন।

এছাড়া কোন কিছু হারিয়ে গেলে বা পেলে হারানো বা পাওয়া অপশনে ক্লিক করুন।

যেটি হারিয়েছে বা যেটি পেয়েছেন, তা সিলেক্ট করুন।

এরপর হারানো বা পাওয়া জিনিসের বিস্তারিত তথ্য দিন। 

জরুরী যোগাযোগে নাম, ফোন, বভাগ,জেলা ইত্যাদি দিয়ে ‘পরবর্তী’ বাটনে ক্লিক করুন।

এরপর সনাক্তকরণ তথ্য, ছবি আপলোড করে ‘পরবর্তী’ বাটনে ক্লিক করুন।

স্থান ও সময়ের বিবরণের সকল ঘর পূরণ করুন।

এরপর অন্যের জন্য জিডি আবেদন করলে, তার তথ্য দিতে হবে। নিজের জন্য আবেদন করলে না দিয়ে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করুন।

সব তথ্য একবার দেখে নিয়ে ‘সাবমিট’ করুন বাটনে ক্লিক করুন।

এরপর মোবাইলের ওটিপি দিতে হবে। জিডির নম্বরটি সংরক্ষণ করে রাখুন।

আবেদন করার পর কী হবে?

আপনার আবেদনটি ‘অপেক্ষমান আবেদন’ অপশন থেকে দেখতে পাবেন।

এখান থেকে জিডির ডিজিটাল কপি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিতে পারবেন।

আবেদনটি সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তার কাছে চলে যাবে।

তিনি তথ্য যাচাই-বাছাই করে এটি অনুমোদন (Approve) করবেন।

জিডিটি অনুমোদিত হলে বা কোনো কারণে বাতিল হলে আপনার মোবাইলে এসএমএস-এর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।

অনুমোদিত হওয়ার পর মূল জিডি কপিটি স্বাক্ষর ও সিলসহ অনলাইন থেকেই ডাউনলোড করা যায়, যা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বৈধ।

অনলাইন জিডির সুবিধা

আমরা অনলাইনে জিডি করার নিয়ম সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জানতে পারলাম।

এখন আমরা জানবো অনলাইনে জিডি করার সুবিধা গুলি কি কি-

১. থানায় যাওয়ার যাতায়াত খরচ এবং দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ঝামেলা নেই।

২. দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার যেকোনো সময় এই সেবাটি পাওয়া যায়।

৩. আপনার জিডির বর্তমান অবস্থা (Status) অনলাইনেই ট্র্যাক করা যায়।

৪. সরাসরি নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে আবেদন করায় কোনো ধরনের প্রতারণার সুযোগ থাকে না।

FAQ – অনলাইনে জিডি করার নিয়ম

১. অনলাইনে জিডি করতে কি কোনো টাকা লাগে?

না, অনলাইনে জিডি করা সম্পূর্ণ ফ্রি বা বিনামূল্যে।

বাংলাদেশ পুলিশের এই সেবার জন্য কোনো ফি দিতে হয় না।

২. অনলাইন জিডির কপি কি সব জায়গায় গ্রহণযোগ্য?

হ্যাঁ, অনলাইন থেকে ডাউনলোড করা কিউআর কোড (QR Code) এবং ডিজিটাল স্বাক্ষরযুক্ত জিডির কপিটি আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বৈধ এবং সব জায়গায় গ্রহণযোগ্য।

৩. জিডি এপ্রুভ বা অনুমোদন হতে কত সময় লাগে?

সাধারণত আবেদন সাবমিট করার পর সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তথ্য যাচাই করে এটি অনুমোদন করে দেন।

অনুমোদন হলে মোবাইলে এসএমএস আসে।

৪. ভুল তথ্য দিয়ে জিডি করলে কী হবে?

অনলাইনে কোনো মিথ্যা বা ভুল তথ্য দিয়ে জিডি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

এমনটি করলে আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

৫. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ছাড়া কি অনলাইনে জিডি করা সম্ভব?

না, অনলাইন জিডি সিস্টেমে পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর, জন্মতারিখ এবং লাইভ ছবি দিয়ে অ্যাকাউন্ট ভেরিফাই করা বাধ্যতামূলক।

উপসংহার – অনলাইনে জিডি করার নিয়ম

পরিশেষে বলা যায়, অনলাইনে জিডি দেশের আইনি সেবাকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দিয়েছে।

এতে থানায় যাওয়ার ঝামেলা থাকছে না।

এছাড়া সময়ের অপচয় এবং দালালদের দৌরাত্ম্য কমে এসেছে।

প্রযুক্তির এই সুবিধা ব্যবহার করে আমরা যেকোনো হারানো বা প্রাপ্তির তথ্য মুহূর্তেই থানায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারি।

তাই আমাদের সকলের অনলাইনে জিডি করার নিয়ম জানা উচিত