আমাদের মধ্যেই অনেকেই, মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার নিয়ম জানতে চান।

কারণ অনেক গর্ভবতী নারী এই সময়টাতে আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন।

মা হওয়া যে কোনো নারীর জীবনের জন্য এক চ্যালেঞ্জিং অধ্যায়।

এই সময়ে পুষ্টি ও বিশ্রামের জন্য আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে বাংলাদেশ সরকার ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’চালু রেখেছে।

এটি মাতৃত্বকালীন ভাতা নামেও পরিচিত।

এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো গর্ভবতী মা ও নবজাতকের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মা এবং শহরাঞ্চলের স্বল্প আয়ের কর্মজীবী নারীদের জন্য এই ভাতা একটি বড় আশার আলো।

সঠিক সময়ে এবং সঠিক নিয়মে আবেদনের মাধ্যমে একজন মা গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে শিশুর তিন বছর বয়স পর্যন্ত এই সরকারি আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন।

এই ব্লগে মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার নিয়ম, শর্ত ও কত টাকা পাওয়া যাবে সেই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

একটি শিশুর জন্ম কেবল একটি পরিবারের আনন্দ নয়।

বরং একটি সুন্দর আগামীর সম্ভাবনা।

কিন্তু গর্ভাবস্থায় একজন মায়ের প্রয়োজন সঠিক পুষ্টি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম।

মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন

এ জন্য বাংলাদেশ সরকার নিম্ন আয়ের পরিবারের নারীদের জন্য এ ভাতার ব্যবস্থা করেছেন।

তবে এই ভাতা পাওয়ার শর্তগুলি হল-

১. আবেদনকারীকে অবশ্যই জন্মসূত্রে বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে ও তার বয়স সর্বনিম্ন ২০ বছর হতে হবে।

২. তাকে অবশ্যই দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য হতে হবে। সাধারণত দিনমজুর, ভূমিহীন বা অতি দরিদ্র পরিবারের মায়েরা অগ্রাধিকার পান।

৩. এই ভাতা কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় গর্ভধারণের জন্য প্রযোজ্য।

৪. গর্ভধারণের ৩ মাস থেকে ৬ মাসের মধ্যে আবেদন করা বাধ্যতামূলক।

৫. একজন গর্ভবতী মা যদি সরকারি অন্য কোনো নিয়মিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির (যেমন: বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা বা ভিডব্লিউবি কার্ড) সুবিধাভোগী হন। তাহলে এই ভাতা পাবেন না।

৬. আবেদনকারী তথ্য প্রদানের সময় সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য দিতে হবে।

মাসে কত টাকা করে ভাতা পাওয়া যাবে – মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন

সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী, মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির টাকার পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

আগে এই ভাতার পরিমাণ ছিল মাসে ৮০০ টাকা। এখন প্রতিমাসে ৮৫০ টাকা করে দেওয়া হবে।

সময়ের সাথে সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে।

একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার (যেমন: দুধ, ডিম, ফলমূল) এবং ঔষধ কেনার খরচ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বাড়তি খরচের সাথে সামঞ্জস্য রাখতেই ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।

বর্তমানে এই ভাতার হার এবং সময়সীমা নিচে দেওয়া হলো:

মাসিক ভাতার পরিমাণ: বর্তমানে একজন মা প্রতি মাসে ৮৫০ টাকা হারে ভাতা পান (আগে এটি ৮০০ টাকা ছিল)।

ভাতা প্রদানের সময়কাল: একজন মা মোট ৩৬ মাস বা ৩ বছর পর্যন্ত এই সুবিধা ভোগ করতে পারেন। সেই হিসেবে তিনি সর্বমোট ৩০,৬০০ টাকা পাবেন।

টাকা প্রদানের পদ্ধতি: এই টাকা সাধারণত ৩ মাস অন্তর অন্তর বা নির্দিষ্ট সময় পর পর সরাসরি উপকারভোগীর মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ বা নগদ) অথবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার জন্য কি কি লাগবে?

মাতৃত্বকালীন ভাতা বা ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’-র জন্য আবেদন করতে হলে আপনাকে কিছু নির্দিষ্ট কাগজপত্র আগে থেকেই গুছিয়ে রাখতে হবে।

এই ভাতা পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুলি হল-

১. আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) ফটোকপি ও ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদের ফটোকপি।

২. আবেদনকারীর স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি।

৩. গর্ভবতী হওয়ার প্রমাণস্বরূপ স্বাস্থ্য কার্ড বা সংশ্লিষ্ট ডাক্তার/স্বাস্থ্যকর্মীর প্রত্যয়নপত্র।

৪. নিজস্ব নামে খোলা একটি সচল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অথবা মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ) নম্বর।

৫. আবেদনকারীর পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।

৬. সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত চারিত্রিক বা নাগরিকত্ব সনদপত্র।

মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করার উপায়

আপনি ২ভাবে এই ভাতার জন্য আবেদন করতে পারবেন। একটি হল অনলাইনে।

আর একটি অফলাইনে সরাসরি কার্যালয়ে যেয়ে।

তবে অনলাইনে আবেদন করার চেয়ে সয়ারসরি কার্যালয়ে যেয়ে আবেদন করাই সবথেকে ভালো হবে।

সরাসরি আবেদন করার প্রক্রিয়াটি হল-

১. কার্যালয়ে যাওয়া

অফলাইনে আবেদন করার জন্য আপনাকে আপনার স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানার জনপ্রতিনিধির কার্যালয়ে যেতে হবে।

সেক্ষেত্রে আপনাকে চেয়ারম্যান বা সংশ্লিষ্ট নারী মেম্বারের কাছে যেতে হবে।

আর পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন পর্যায়ে আপনার ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে যেতে হবে।

২. আবেদন ফরম সংগ্রহ

কার্যালয় থেকে নির্ধারিত ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’-র আবেদন ফরম সংগ্রহ করুন।

অনেক সময় এটি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারেও পাওয়া যায়।

ফরমটি বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, তবে ফটোকপি বাবদ সামান্য খরচ হতে পারে।

৩. ফরম পূরণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্তকরণ

ফরমে আপনার নাম, স্বামীর নাম, এনআইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর এবং গর্ভধারণের তথ্য সঠিকভাবে লিখুন।

এরপর নিচের কাগজগুলো পিন দিয়ে আটকিয়ে দিন:

১. আবেদনকারীর NID কার্ডের ফটোকপি।

২. আবেদনকারীর স্বামীর NID কপি।

৩. গর্ভকালীন হেলথ কার্ড বা ডাক্তারী প্রত্যয়নপত্র।

৪. পাসপোর্ট সাইজের ছবি (২ কপি)।

৫. ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ) হিসাবের সঠিক তথ্য।

৪. আবেদন জমা দেওয়া

ফরম পূরণ শেষ হলে এটি আপনার এলাকার নারী ইউপি সদস্য (মেম্বার) অথবা সরাসরি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের কাছে জমা দিন।

জমাদানের সময় একটি প্রাপ্তি স্বীকারপত্র বা ডায়েরি নম্বর সংগ্রহ করার চেষ্টা করুন।

৫. তথ্য যাচাইকরণ (ভেরিফিকেশন)

আবেদন জমা দেওয়ার পর ইউনিয়ন বা পৌরসভা পর্যায়ের একটি যাচাই-বাছাই কমিটি আপনার দেওয়া তথ্যগুলো খতিয়ে দেখবে।

প্রয়োজনে সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী বা ফ্যামিলি প্ল্যানিং কর্মীরা আপনার বাড়িতে এসে আপনার গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করবেন।

৬. চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন

যাচাইকরণ শেষ হলে একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হয়।

এই তালিকায় আপনার নাম অন্তর্ভুক্ত হলে আপনাকে ফোনে মেসেজের মাধ্যমে বা মেম্বার/কাউন্সিলরের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।

এরপর থেকে আপনার অ্যাকাউন্টে গর্ভবতী ভাতা এর টাকা আসা শুরু হবে।

মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন করতে কিছু গুরত্বপূর্ণ বিষয় মেনে চলা জরুরী

আবেদনের সময়:

গর্ভাবস্থার ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে অফলাইনে যোগাযোগ করা সবচেয়ে ভালো। দেরি করলে সেই বছরের কোটা পূর্ণ হয়ে যেতে পারে।

সতর্কতা:

আবেদন ফরম জমা দেওয়ার জন্য কাউকে কোনো বাড়তি টাকা দেবেন না। এটি সম্পূর্ণ সরকারি সেবা।

টাকা প্রাপ্তি:

আবেদনের অনুমোদন হয়ে গেলে সরাসরি আপনার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে (বিকাশ/নগদ) ভাতার টাকা চলে আসবে।

এর জন্য কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

FAQ: মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন

১. আবেদনের জন্য সর্বনিম্ন বয়স কত হতে হবে?

আবেদনকারীর বয়স অবশ্যই সর্বনিম্ন ২০ বছর হতে হবে। ২০ বছরের কম বয়সী মায়েরা এই কর্মসূচির আওতায় আবেদন করতে পারবেন না।

২. প্রতি মাসে কত টাকা পাওয়া যায় এবং কতদিন পর্যন্ত?

বর্তমানে এই ভাতার পরিমাণ মাসে ৮৫০ টাকা। এটি গর্ভকালীন সময় থেকে শুরু করে শিশুর ৩ বছর বয়স পর্যন্ত অর্থাৎ মোট ৩৬ মাস প্রদান করা হয়।

৩. গর্ভবতী ভাতার টাকা কীভাবে পাওয়া যায়?

ভাতার টাকা সরাসরি আবেদনকারীর নিজস্ব বিকাশ, নগদ, রকেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল পদ্ধতিতে (G2P) পাঠানো হয়।

৪. আমি কি গর্ভাবস্থার যেকোনো সময় আবেদন করতে পারি?

না। নিয়ম অনুযায়ী, গর্ভধারণের ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে আবেদন করা সবচেয়ে ভালো।

৫. আবেদন করতে কি কোনো ফি বা টাকা লাগে?

না। এই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

৬. আমি যদি অন্য কোনো সরকারি ভাতা পাই, তবে কি এটি পাবো?

না। আপনি যদি সরকারের অন্য কোনো নিয়মিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি (যেমন: বিধবা ভাতা বা ভিডব্লিউবি কার্ড) থেকে সুবিধা পান, তবে আপনি মাতৃত্বকালীন ভাতার জন্য যোগ্য হবেন না।

উপসংহার – মাতৃত্বকালীন ভাতা আবেদন

বর্তমানে গর্ভবতী ভাতা আবেদন প্রক্রিয়া অনেক স্বচ্ছ ও সহজ হয়েছে।

তাই আপনি নিজে অথবা আপনার পরিচিত কোনো যোগ্য মা এর জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে আবেদন করুন।

আর সকল তথ্য ও কাগজ নির্ভুল হতে হবে।

এছাড়া পেমেন্ট নম্বর খুব সতর্কতার সহিত দিতে হবে।

তাই আপনি যদি এর আওতার থাকেন, তাহলে খুব তাড়াতাড়ি আবেদন করুন।

সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যের মাধ্যমে আবেদন করলে একজন মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত হবে ও নবজাতকের সুস্থ বিকাশ সম্ভব হবে।