ডিজিটাল জামিননামা চালু হয়েছে।
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় এই দীর্ঘসূত্রতা এবং এনালগ পদ্ধতির ভোগান্তি দীর্ঘদিনের।
কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই চিত্র বদলে যেতে শুরু করেছে।
আইন ও বিচার বিভাগের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘ডিজিটাল জামিননামা’ বা ‘ই-বেইল বন্ড’ (E-Bail Bond)।
এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির মাধ্যমে এখন আদালত থেকে জামিনের আদেশ মুহূর্তের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে জেলখানায়।
এটি কেবল বিচারিক প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করেনি, বরং ঘুচিয়ে দিয়েছে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং ভুয়া জামিননামার ঝুঁকি।
আজকের ব্লগে আমরা জানব, ডিজিটাল জামিননামা কি, এর সুবিধা গুলি কি কি?
আমাদের দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো জামিন।
কিন্তু প্রচলিত পদ্ধতিতে জামিন পাওয়ার পর আদালত থেকে জেলখানা পর্যন্ত কাগজের নথি পৌঁছাতে যে দীর্ঘ সময় লাগে, তাতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়।
ই ভোগান্তি কমাতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে ডিজিটাল জামিননামা।
জিটাল জামিননামা হলো একটি অনলাইন ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি, যার মাধ্যমে আদালত প্রদত্ত জামিনের আদেশ সরাসরি এবং তাৎক্ষণিকভাবে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়।
এতে সনাতন পদ্ধতির মতো কাগজের কপি হাতে হাতে বহন করার প্রয়োজন পড়ে না।
ডিজিটাল জামিননামা কবে চালু হয়েছে
বাংলাদেশে ডিজিটাল জামিননামা বা E-Bail Bond ব্যবস্থাটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় চালু করেছেন।
এই আধুনিক ব্যবস্থার উদ্বোধন করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই উদ্যোগের তদারকি করছেন এবং একে বিচার বিভাগের ডিজিটালাইজেশনের একটি বড় মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এটি প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় ১৫ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে। প্রথম জেলা হিসেবে এটি নারায়ণগঞ্জে উদ্বোধন করা হয়।
নারায়ণগঞ্জের সফলতার পর, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে আরও ৮টি জেলায় এই সেবাটি সম্প্রসারিত করা হয়। জেলাগুলো হলো:
১. মানিকগঞ্জ
২. বান্দরবান
৩. মেহেরপুর
৪. জয়পুরহাট
৫. মৌলভীবাজার
৬. পঞ্চগড়
৭. ঝালকাঠি
৮. শেরপুর
ডিজিটাল জামিননামা এর সুবিধাগুলি কি কি?
ডিজিটাল জামিননামা বা E-Bail Bond চালুর ফলে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী এবং কারা কর্তৃপক্ষ—সব পক্ষই বহুমুখী সুবিধা ভোগ করছেন। এর প্রধান সুবিধাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. দ্রুত মুক্তি নিশ্চিতকরণ
আগে আদালত থেকে জামিনের আদেশের কপি (Bail Order) পিয়নের মাধ্যমে বা ডাকযোগে জেলখানায় পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন লেগে যেত।
এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই আদেশ পৌঁছে যায়, ফলে জামিন পাওয়ার পর আসামিকে অহেতুক অতিরিক্ত সময় জেলে থাকতে হয় না।
২. ভুয়া জামিননামা ও জালিয়াতি রোধ
কাগজে কলমে সিল বা স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া জামিননামা তৈরির একটি বড় ঝুঁকি ছিল।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রতিটি জামিননামায় একটি কিউআর কোড (QR Code) এবং ইউনিক সিকিউরিটি পিন থাকে।
কারা কর্তৃপক্ষ অনলাইনে ডাটাবেজ চেক করে আদেশের সত্যতা যাচাই করতে পারেন, যা জালিয়াতি শতভাগ বন্ধ করে দিয়েছে।
৩. মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্য হ্রাস
আদালত থেকে জেলখানায় নথি পৌঁছানোর নাম করে অনেক সময় দালাল বা অসাধু চক্র বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিত।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি সার্ভার টু সার্ভার তথ্য আদান-প্রদান হওয়ায় এই অবৈধ লেনদেনের পথ বন্ধ হয়েছে।
৪. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
পুরো প্রক্রিয়াটি একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
কখন আদেশ দেওয়া হলো, কখন তা জেলে পৌঁছাল এবং কখন আসামি মুক্তি পেল, তার প্রতিটি ধাপের রেকর্ড সিস্টেমে থেকে যায়।
এতে কাজের স্বচ্ছতা বাড়ে এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
৫. অর্থ ও শ্রম সাশ্রয়
কাগজপত্র প্রিন্ট করা, ফটোকপি করা এবং তা বহন করে জেলখানায় নিয়ে যাওয়ার ঝামেলা নেই।
এতে সরকারি খরচ যেমন কমছে, তেমনি বিচারপ্রার্থীদেরও যাতায়াত বা অতিরিক্ত ফি দেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না।
৬. ডাটাবেজ সংরক্ষণ
ডিজিটাল সিস্টেম হওয়ার কারণে কোনো আসামির পূর্ববর্তী জামিনের রেকর্ড বা মামলার বর্তমান অবস্থা এক ক্লিকেই দেখে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এটি বিচারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আদালতকে সহায়তা করে।
ডিজিটাল জামিননামা কিভাবে কাজ করে
ডিজিটাল জামিননামা বা E-Bail Bond একটি সুসমন্বিত সফটওয়্যার সিস্টেমের মাধ্যমে কাজ করে, যা আদালত এবং কারাগারের মধ্যে একটি সরাসরি ‘ডিজিটাল সেতু’ তৈরি করে।
এই সফটওয়্যারটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে আইন মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।
নিচে এর কার্যপ্রণালী ধাপে ধাপে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
১. আদেশ প্রদান: বিজ্ঞ আদালত কোনো আসামির জামিন মঞ্জুর করলে তা সফটওয়্যারে এন্ট্রি করা হয়।
২. যাচাইকরণ: সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে আদেশটি নিশ্চিত করেন।
৩. তাৎক্ষণিক প্রেরণ: জেলখানায় থাকা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জামিনের বিস্তারিত তথ্য পৌঁছে যায়।
৪. মুক্তি: কারা কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ থেকে তথ্য মিলিয়ে দ্রুত আসামিকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
FAQ: ডিজিটাল জামিননামা
১. ডিজিটাল জামিননামা পেতে কি অতিরিক্ত কোনো ফি দিতে হয়?
না। ডিজিটাল জামিননামা বা ই-বেইল বন্ড একটি সরকারি সেবা। এর জন্য নির্ধারিত আইনি ফি ছাড়া কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা ‘স্পিড মানি’ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
২. এটি কি বাংলাদেশের সব জেলায় চালু হয়েছে?
বর্তমানে এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে নারায়ণগঞ্জসহ বেশ কিছু জেলায় (মানিকগঞ্জ, বান্দরবান, মেহেরপুর ইত্যাদি) সফলভাবে চলছে।
পর্যায়ক্রমে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সারাদেশের প্রতিটি আদালতে এই সেবা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
৩. জামিন পাওয়ার কতক্ষণ পর আসামি মুক্তি পাবেন?
ডিজিটাল জামিননামা আদালত থেকে সাবমিট করার সাথে সাথেই জেলখানায় পৌঁছে যায়।
কারাগারের অভ্যন্তরীণ কিছু আনুষ্ঠানিকতা (যেমন: অন্য কোনো মামলায় পরোয়ানা আছে কি না তা যাচাই করা) শেষ হতে সাধারণত ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
উপসংহার – ডিজিটাল জামিননামা
পরিশেষে বলা যায়, ডিজিটাল জামিননামা বা ই-বেইল বন্ড কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও মানবিকতা নিশ্চিত করার এক সাহসী পদক্ষেপ।
দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং “কাগজ পৌঁছায়নি” বলে আসামির অতিরিক্ত কারাভোগের যে সংস্কৃতি ছিল, এই আধুনিক পদ্ধতি তার অবসান ঘটাচ্ছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের এই সময়োপযোগী উদ্যোগ বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও মানসিক হয়রানি অনেকাংশেই কমিয়ে আনবে।
আমরা আশা করি, খুব দ্রুত দেশের প্রতিটি জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং সকল কারাগারে এই ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে।
একটি সমৃদ্ধ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে হলে বিচার বিভাগের এমন আধুনিকায়ন অপরিহার্য।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজলভ্য হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
আপনার পছন্দ হতে পারে এমন আরো পোস্ট


