ভোটার আইডি কার্ডে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করার নিয়ম এখন অনেক সহজ।
ভোটার আইডি কার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রধান দলিল।
জীবনযাত্রার প্রয়োজনে আমাদের অনেক সময় এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হয়।
যখন আপনি আপনার স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানা পরিবর্তন করেন, তখন ভোটার তালিকায় আপনার নাম নতুন এলাকায় স্থানান্তর করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে বর্তমানে অনলাইন এবং অফলাইন উভয় পদ্ধতিতেই ভোটার এলাকা পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
সঠিক নিয়মে ভোটার এলাকা স্থানান্তর না করলে ভোট প্রদান, স্থানীয় নাগরিক সুবিধা ভোগ এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব কীভাবে সহজে এবং সঠিক পদ্ধতিতে আপনি আপনার ভোটার এলাকা পরিবর্তন করতে পারেন।
ভোটার আইডি কার্ডে ভোটার এলাকা পরিবর্তন বা স্থানান্তর করা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং নাগরিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এলাকা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিচে তুলে ধরা হলো:
ভোট প্রদানের অধিকার:
বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী, আপনি কেবল সেই এলাকাতেই ভোট দিতে পারবেন যেখানে আপনার নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে।
স্থায়ীভাবে অন্য এলাকায় বসবাস করলে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুবিধার্থে এলাকা পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ:
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া বা পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য ওই নির্দিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়া বাধ্যতামূলক।
নাগরিক সুযোগ-সুবিধা:
অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন ভাতা (যেমন: বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা) বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হতে হয়।
ঠিকানার প্রমাণ (Address Proof):
বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, পাসপোর্ট করা বা ইউটিলিটি কানেকশন (গ্যাস, বিদ্যুৎ) নেওয়ার সময় ভোটার আইডির বর্তমান ঠিকানা
অনেক সময় বর্তমান বসবাসের ঠিকানার সাথে মিল থাকা প্রয়োজন হয়।
সঠিক ডাটাবেজ নিশ্চিতকরণ:
জাতীয় পরিচয়পত্র বা NID ডাটাবেজে আপনার সঠিক তথ্য থাকা রাষ্ট্রের পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করে।
এটি আপনার বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করে আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত রাখে।
ভোটার আইডি কার্ডে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করতে কি কি কাগজপাতি লাগবে
ভোটার এলাকা পরিবর্তনের (ভোটার স্থানান্তর) জন্য সাধারণত ফরম-১৩ এর সাথে কিছু প্রয়োজনীয় দলিলাদি বা কাগজপত্র জমা দিতে হয়।
নিচে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা দেওয়া হলো:
১. বর্তমান এনআইডি (NID) কার্ডের ফটোকপি: আবেদনকারীর মূল জাতীয় পরিচয়পত্রের একটি পরিষ্কার ফটোকপি।
২. নতুন এলাকার ঠিকানার প্রমাণপত্র: আপনি যে নতুন এলাকায় স্থানান্তরিত হতে চাচ্ছেন, সেখানে বসবাসের প্রমাণ হিসেবে নিচের যেকোনো একটি কাগজ লাগবে:
- বাসার হোল্ডিং ট্যাক্স রশিদ।
- বিদ্যুৎ, পানি বা গ্যাস বিলের কপি (আবেদনকারীর নিজের বা পরিবারের সদস্যের নামে)।
- ভাড়াটিয়া হলে বাড়ি ভাড়ার চুক্তিনামা বা রশিদের কপি।
- জমির দলিলের কপি (যদি প্রযোজ্য হয়)।
৩. নাগরিকত্ব সনদ: নতুন এলাকার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত নাগরিকত্ব সনদপত্র।
ভোটার আইডি কার্ডে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করার নিয়ম
ভোটার আইডি কার্ডে ভোটার এলাকা পরিবর্তন বা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ভোটার স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি এখন বেশ সহজ।
আপনি এটি অনলাইনে এটি সম্পন্ন করতে পারেন।
নিচে ধাপগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ধাপ ১: রেজিস্ট্রেশন ও লগইন
প্রথমে https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/ এই লিংকে যেতে হবে।
এখান থেকে রেজিস্টার করুন বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এখানে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্ম তারিখ এবং ক্যাপচা কোড দিয়ে সাবমিট বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এরপর অ্যাকাউন্ট রেজিস্টার পেজ থেকে বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার বিভাগ, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন করে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করতে হবে।
আপনার ইমেইল বা মোবাইল এর মাধ্যমে ভেরিফিকেশনের জন্য যেকোন একটি দিয়ে ওটিপি পাঠান বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এক্ষেত্রে আপনার মোবাইল দিয়ে ভেরিফিকেশন করা সবথেকে ভালো হবে।
আপনার নম্বরে পাওয়া ৬ ডিজিটের কোডটি বসিয়ে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করতে হবে।
ধাপ ২: ফেস ভেরিফিকেশন (NID Wallet)
নিরাপত্তার স্বার্থে আপনার চেহারা যাচাই করা হবে।
আপনার মোবাইলে ‘NID Wallet‘ অ্যাপটি গুগল প্লেস্টোর থেকে ডাউনলোড করে নিতে হবে। এরপর QR স্ক্যান করে নিতে হবে।
স্ক্যান করে Start Face scan বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এরপর মোবাইলের ক্যামেরার সামনে আপনার মুখমণ্ডল ডানে-বামে ও সোজাসুজি ঘুরিয়ে ভেরিফিকেশন শেষ করতে হবে।
ধাপ ৩: তথ্য এডিট বা সংশোধন
তারপর আপনার আগের ওয়েবপেজ থেকে দেখতে পাবেন, আপনি লগিন হয়ে গেছেন।
এরপর এড়িয়ে যান বাটনে ক্লিক করতে হবে।
প্রোফাইল বাটনে ক্লিক করতে হবে।
বাটনে ক্লিক করে এডিট বাটনে ক্লিক করতে হবে। তারপর বহাল বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এরপর ঠিকানা পরিবর্তন করে নিতে হবে।
ধাপ ৪: ফি প্রদান
আপনার তথ্য পরিবর্তনের জন্য কত টাকা লাগবে,তা দেখা যাবে।
এরপর আপনি যদি বিকাশ থেকে পেমেন্ট করতে চান, তাহলে বিকাশের অ্যাপে যেয়ে পে বিল বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এখানে সার্চ বার থেকে nid service লিখে সার্চ করতে হবে।
তারপর এখান থেকে Nid servcie এ ক্লিক করতে হবে।
আপনি যে ধরনের পরিবর্তন চান,তা সিলেক্ট করে দিতে হবে।
এরপর আপনার NID নম্বর দিতে হবে।
পে বিল করার জন্য এগিয়ে যান বাটনে ক্লিক করতে হবে।
আপনার নির্ধারিত ফি আপনি দেখতে পারবেন। এটি ২৩০ থেকে ৩৪৫ টাকা বা তার বেশি হতে পারে।
এরপর পরের ধাপে যেতে ট্যাপ করুন বাটনে ক্লিক করতে হবে। এখানে আপনার বিকাশের পিন দিয়ে পেমেন্ট করে দিতে হবে।
ধাপ ৫: ডকুমেন্ট আপলোড
ফি প্রদান শেষে আপনার পুনরায় আগের পেজে যেতে হবে। সেখান থেকে পরবর্তী বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এখান থেকে আপনার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজের স্ক্যান করা ছবি আপলোড করতে হবে।
যেমন- বাসার হোল্ডিং ট্যাক্স রশিদ, বিদ্যুৎ, পানি বা গ্যাস বিলের কপি (আবেদনকারীর নিজের বা পরিবারের সদস্যের নামে),ভাড়াটিয়া হলে বাড়ি ভাড়ার চুক্তিনামা বা রশিদের কপি,জমির দলিলের কপি (যদি প্রযোজ্য হয়) ইত্যাদি।
কোন পরিবর্তনের জন্য কোন কাগজ আপলোড করতে হবে,তা জানতে এই লিংকে ক্লিক করুন
https://www.nidw.gov.bd/LawsRulesNIDCorrection.php
এরপর পরবর্তী বাটনে ক্লিক করতে হবে।
এখান থেকে আপনার সংশোধিত ও ডকুমেন্ট গুলি দেখতে পাবেন। এরপর সাবমিট বাটনে ক্লিক করতে হবে।
ধাপ ৬: আবেদন জমা ও কনফার্মেশন
আপনার প্রোফাইল সেকশন থেকে দেখতে পাবেন, আপনার একটি অ্যাপ্লিকেশন পেন্ডিং রয়েছে এই ম্যাসেজ।
এখান থেকে ডাউনলোড বাটনে ক্লিক করে অ্যাপ্লিকেশন কপি ডাউনলোড করে নিবেন।
এরপর আপনাকে কমপক্ষে ১৫ কার্যদিবস অপেক্ষা করতে হবে। এর বেশিও হতে পারে।
আপনার আবেদন যাচাই বাচাই শেষে সেটি অনুমোদিত হলে,
আপনার মোবাইলে একটি sms আসবে। যদি sms না পেয়ে থাকেন, তাহলে নির্বাচন অফিসে যেয়ে যোগাযোগ করতে পারেন।
তারা আপনাকে জানাতে পারবে আপনার আবেদনটি কোন পর্যায়ে আছে।
আপনার তথ্য পরিবর্তন হলে, আপনি পোর্টালে যেয়ে সংশোধিত কার্ডটি দেখতে পাবেন।
চাইলে সেটি ডাউনলোড করে ও প্রিন্ট করে নিতে পারেন।
ভোটার আইডি কার্ডে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করতে কত খরচ হয়
এলাকা পরিবর্তন করলে আপনার কাছে থাকা বর্তমান NID কার্ডটি পরিবর্তন করে নতুন কার্ড দেওয়া হয় না।
শুধু নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেজে আপনার ঠিকানা ও ভোটার এলাকা আপডেট হয়ে যায়।
তবে আপনি যদি পরিবর্তিত ঠিকানাসহ একটি নতুন ডিজিটাল কার্ড (Smart Card/Re-issue) প্রিন্ট করতে চান, সেক্ষেত্রে সংশোধনের জন্য নির্ধারিত ফি (সাধারণত ২৩০ থেকে ৩৪৫ টাকা) প্রদান করে নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করতে হবে।
FAQ: ভোটার আইডি কার্ডে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করার নিয়ম
১. ভোটার এলাকা পরিবর্তন করলে কি নতুন এনআইডি কার্ড দেওয়া হয়?
না। এলাকা পরিবর্তন করলে শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেজে আপনার ভোটিং এলাকা আপডেট হয়।
আপনার কাছে থাকা বর্তমান কার্ডটিই ব্যবহারযোগ্য থাকবে।
তবে আপনি যদি নতুন ঠিকানাসহ কার্ড পেতে চান, তবে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে ‘রি-ইস্যু’ আবেদন করতে হবে।
২. অনলাইনে আবেদন করলে কি অফিসে যেতে হবে?
হ্যাঁ। অনলাইনে আবেদন করার পর সেটির প্রিন্ট কপি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মূলকপি নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে গিয়ে জমা দিতে হয়।
অনেক সময় তারা আপনার বর্তমান অবস্থান যাচাই করতে পারেন।
৩. আমি কি স্থায়ী ও বর্তমান উভয় ঠিকানাই পরিবর্তন করতে পারি?
হ্যাঁ, আপনি আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানা পরিবর্তনের আবেদন করতে পারেন।
তবে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আপনি যে নতুন এলাকায় ভোটার হতে চান, সেখানে আপনার বসবাসের শক্তিশালী প্রমাণপত্র দেখাতে হবে।
৪. এলাকা পরিবর্তন হতে কতদিন সময় লাগে?
সাধারণত আবেদন জমা দেওয়ার পর তদন্ত সাপেক্ষে ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এলাকা পরিবর্তন সম্পন্ন হয়।
তবে এটি সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের কাজের চাপের ওপর নির্ভর করে কম-বেশি হতে পারে।
৫. ছাত্ররা কি তাদের মেস বা হোস্টেলের ঠিকানায় ভোটার হতে পারবে?
সাধারণত ছাত্রাবাস বা মেসের ঠিকানায় ভোটার হওয়া যায় না। তবে আপনি যদি ওই এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং তার সপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ (যেমন: গ্যাস বিল বা বাড়ি ভাড়ার চুক্তি) দেখাতে পারেন, তবে আবেদন করা সম্ভব।
উপসংহার – ভোটার আইডি কার্ডে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করার নিয়ম
পরিশেষে বলা যায়, ভোটার আইডি কার্ডে এলাকা পরিবর্তন করা একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
আপনি যখন এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থায়ীভাবে বা দীর্ঘ সময়ের জন্য বসবাস শুরু করেন, তখন সেই এলাকার ভোটার তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
এতে শুধু আপনার ভোটাধিকার নিশ্চিত হয় না, বরং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়াও সহজ হয়।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং সহজতর করা হয়েছে।
তবে মনে রাখবেন, আবেদন করার সময় সঠিক ও সত্য তথ্য প্রদান করা আবশ্যক, অন্যথায় আপনার আবেদনটি বাতিল হয়ে যেতে পারে।
আশা করি, আজকের এই ব্লগের মাধ্যমে আপনি ভোটার এলাকা পরিবর্তনের সম্পূর্ণ নিয়ম ও প্রয়োজনীয় ধাপগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছেন।


