বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রতিবন্ধী ভাতা অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে।

কারণ, সরকারি প্রায় সব সেবা এখন ইন্টারনেট ও অনলাইন পোর্টালের কল্যাণে মানুষের হাতের নাগালে।

এটি একটি মানবিক ও গুরুত্বপূর্ণ ভাতা। এক সময় এই ভাতার জন্য আবেদন করতে মাসের পর মাস সরকারি অফিসের বারান্দায় ঘুরতে হতো, কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে।

সমাজসেবা অধিদফতরের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির ফলে এখন একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা তাঁর পরিবার ঘরে বসেই মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে ভাতার জন্য আবেদন করতে পারেন।

এই অনলাইন প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত মেধাবী ও অসহায় প্রতিবন্ধীদের কাছে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।

অনেকেই সঠিক নিয়ম না জানার কারণে অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়েন বা দালালের খপ্পরে পড়েন।

আজকের এই ব্লগে আমরা সহজ ভাষায় আলোচনা করব কীভাবে আপনি সঠিক পদ্ধতিতে প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য অনলাইন আবেদন করবেন, কী কী কাগজ লাগবে এবং আবেদনের পর আপনাকে কোথায় যেতে হবে।

এই পোস্টে যা যা থাকছে-

প্রতিবন্ধী ভাতা অনলাইন আবেদন এর শর্ত

বাংলাদেশে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার জন্য সরকার নির্দিষ্ট কিছু শর্ত বা যোগ্যতা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

প্রতিবন্ধী ভাতা অনলাইন আবেদন

সমাজসেবা অধিদফতরের নিয়ম অনুযায়ী, এই ভাতা পেতে হলে আবেদনকারীকে অবশ্যই নিচের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে-

১. নাগরিকত্ব ও স্থায়ী ঠিকানা

আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে।

আবেদনকারী যে এলাকার সমাজসেবা অফিসে আবেদন করছেন, তাকে সেই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।

২. প্রতিবন্ধী হিসেবে নিবন্ধিত হওয়া

আবেদনকারীর কাছে সমাজসেবা অধিদফতর কর্তৃক প্রদত্ত ‘সুবর্ণ কার্ড’ বা ডিজিটাল প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র থাকতে হবে।

৩. আর্থিক অবস্থা বা আয়সীমা

ভাতাটি মূলত ‘অসচ্ছল’ প্রতিবন্ধীদের জন্য।

আবেদনকারীর বার্ষিক গড় আয় ৩৬,০০০ (ছত্রিশ হাজার) টাকার নিচে হতে হবে।

এই সীমা সরকার সময়ে সময়ে পরিবর্তন করতে পারে।

৪. বয়সের সীমাবদ্ধতা

প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই।

শিশু থেকে বৃদ্ধ যেকোনো বয়সের নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভাতার জন্য আবেদন করতে পারেন।

৫. অন্য কোন ভাতার আওতায় না থাকা

অন্য কোনো সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি (যেমন: বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা) থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধাভোগী, চাকরিজীবী বা সরকারি পেনশনভোগী ও যাদের বার্ষিক আয় নির্ধারিত সীমার বেশি তারা এই ভাতা পাবেন না।

প্রতিবন্ধী ভাতা অনলাইন আবেদন এর জন্য কি কি কাগজপাতি লাগবে

প্রতিবন্ধী ভাতার অনলাইন আবেদন এবং পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করতে আপনার যে কাগজগুলো প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন,

তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো-

১. সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত নীল রঙের ডিজিটাল পরিচয়পত্র।

যেটি সুবর্ণ কার্ড (Disability ID) নামে পরিচিত। এর ডিআইএস (DIS) নম্বর অবশ্যই লাগবে।

২. আবেদনকারীর এনআইডি কার্ডের মূল কপি ও ফটোকপি।

এছাড়া আবেদনকারীর বয়স ১৮ বছরের কম হলে ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদের কপি লাগবে।

৩. আবেদনকারীর সদ্য তোলা ২-৩ কপি রঙিন ছবি।

৪. অনলাইন ফরমে আপলোড করার জন্য একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর বা আঙুলের ছাপের ছবি।

৫. সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা পৌরসভার মেয়র/কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত চারিত্রিক ও নাগরিকত্ব সনদপত্র।

৬. একটি সচল মোবাইল নম্বর (আবেদনকারীর নিজের বা পরিবারের কারো নামে নিবন্ধিত)

৭. আবেদনকারীর বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে সেই নম্বরটি।

আর যদি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে ব্যাংক এশিয়া বা অন্য নির্ধারিত ব্যাংকের হিসাব নম্বর ও অনলাইন রাউটিং নম্বর।

আবেদনটি সফলভাবে জমা দিতে এবং অনুমোদনের জন্য এই কাগজগুলোর স্ক্যান কপি (অনলাইনের জন্য) এবং ফটোকপি (অফিসে জমা দেওয়ার জন্য) সাথে রাখতে হবে।

প্রতিবন্ধী ভাতা অনলাইন আবেদন করার নিয়ম

প্রতিবন্ধী ভাতার অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়াটি এখন অনেক সহজ এবং আধুনিক।

নিচে ধাপে ধাপে আবেদন করার সঠিক নিয়ম দেওয়া হলো:

ধাপ ১: অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ

প্রথমে এই লিংকে https://dss.bhata.gov.bd/online-application প্রবেশ করতে হবে।

এখান থেকে ভাতা কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী ভাতা সিলেক্ট করতে হবে।
ডিআইএস (DIS) নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে ডিআইএস যাচাই করুন বাটনে ক্লিক করতে হবে।

ধাপ ২: আবেদনকারী যাচাইকরণ

আপনার ডিআইএস (DIS) নম্বর ঠিক থাকলে একটি ফর্ম ওপেন হবে।

এখান থেকে যাচাইকরন ধরন, সম্পূর্ণ নাম বাংলা ও ইংরেজি, জাতীয় পরিচয় পত্র বা জন্ম নিবন্ধন নম্বর, লিঙ্গ, ক্যাপচা দিয়ে পরবর্তী ধাপ বাটনে ক্লিক করতে হবে।

ধাপ ৩: ব্যক্তিগত তথ্য

এখানে আবেদনকারীর ছবি ও সাক্ষরের ছবি আপলোড করতে হবে।

এরপর পিতার নাম বাংলা ও ইংরেজীতে, মাতার নাম বাংলা ও ইংরেজীতে, মোবাইল নম্বর, বৈবাহিক অবস্থা, ধর্ম, জাতীয়তা, বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা দিতে হবে।

নিচে থেকে স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা দিতে হবে। দুইটাই একই হলে টিক বক্সে টিক দিতে হবে।

ধাপ ৪: প্রতিবন্ধী ভাতা অনুযায়ী বিস্তারিত

এখানে ডিআইএস নম্বর, বাসস্থান, ভূমির মালিকানা, বার্ষিক আয়, প্রতিবন্ধিতার মাত্রা, প্রতিবন্ধিতার ধরন, গত এক বছরে কোন সহায়তা পেয়েছে কিনা দিয়ে দিতে হবে।

ধাপ ৫: পেমেন্ট তথ্য

এখানে অ্যাকাউন্ট ধরণ, অ্যাকাউন্টের মালিকানা, এম এফ এস (বিকাশ/নগদ/রকেট/উপায়/এমক্যাশ), মোবাইল নম্বর, হিসাবের নাম, ইমেইল দিতে হবে।

ধাপ ৬: নমিনীর তথ্য

হ্যাঁ অথবা না সিলেক্ট করতে হবে। হ্যাঁ দিলে সম্পূর্ন তথ্য পূরণ করে দিতে হবে।

ধাপ ৭: যোগ্যতার অন্যান্য তথ্য

এখান খানা সদস্যা সংখ্যা, খানার শিশু সংখ্যা,খানার প্রধানের বয়স, খানা প্রধানের শিক্ষা, স্বামী স্ত্রীর শিক্ষা ইত্যাদি সকল তথ্য পূরণ করে দিতে হবে।

এরপর সাবমিট বাটনে ক্লিক করতে হবে।

ধাপ ৮: আবেদন ডাউনলোড করা

এখানে আবেদন ডাউনলোড করুন বাটনে ক্লিক করে সম্পূর্ণ আবেদনটি দেখতে পাবেন।

এটি ডাউনলোড করে কম্পিউটারের দোকান থেকে প্রিন্ট করে নিতে হবে।

ধাপ ৯: আবেদন পত্র ও অন্যান্য কাগজ নিয়ে কার্যালয়ে যেয়ে জমা দেওয়া

অনলাইনে আবেদন করার পর আপনার কাছে যে আবেদনপত্রের কপি থাকবে, সেটি প্রিন্ট করে আপনাকে আপনার স্থায়ী ঠিকানার সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা অফিসে জমা দিতে হবে।

এটি উপজেলা সমাজসেবা অফিস বা হর সমাজসেবা অফিসে নিয়ে যেতে হবে

এর সাথে যে সকল কাগজ নিতে হবে, তা হল-

  • আপনার সুবর্ণ কার্ড (প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র)-এর ফটোকপি।
  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি।
  • আবেদনকারীর ২-৩ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
  • নাগরিকত্ব সনদ (চেয়ারম্যান বা কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত)।

ধাপ ১০: টাকা কিভাবে পাওয়া যাবে

আপনি কাগজগুলো জমা দেওয়ার পর সমাজসেবা অফিসার আপনার তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখবেন।

ক্ষেত্রবিশেষে ইউনিয়ন সমাজকর্মী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আপনার বাড়িতে গিয়ে আপনার আর্থ-সামাজিক অবস্থা যাচাই করতে পারেন।

উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কমিটির মিটিংয়ে আপনার নাম অনুমোদিত হলে আপনি ভাতার জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হবেন।

আপনার আবেদনটি গৃহীত হলে আপনার মোবাইলে একটি নিশ্চিতকরণ মেসেজ আসবে।

আপনি আবেদনের সময় যে বিকাশ বা নগদ নম্বরটি দিয়েছেন, সেই নম্বরে সরাসরি ভাতার টাকা চলে আসবে।

টাকা আসলে আপনার মোবাইলে একটি এসএমএস আসবে। ভাতার টাকা প্রতি ৩ মাস অন্তর অন্তর (জানুয়ারি-মার্চ, এপ্রিল-জুন এভাবে) কিস্তিতে আপনার একাউন্টে জমা হয়।

একবার আপনি ভাতার জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হলে এবং আপনার নাম ‘বই’ বা ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হলে, আপনি আজীবন এই ভাতা পেতে থাকবেন।

প্রতিবন্ধী ভাতা অনলাইন আবেদন করলে কত টাকা মাসিক পাওয়া যাবে

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সমাজসেবা অধিদফতরের নিয়ম অনুযায়ী, একজন তালিকাভুক্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মাসিক ৮৫০ টাকা হারে ভাতা পেয়ে থাকেন। 

তবে এই টাকা প্রতি মাসে আলাদাভাবে না দিয়ে সাধারণত ৩ মাস অন্তর অন্তর এককালীন কিস্তিতে প্রদান করা হয়।

অর্থাৎ, প্রতি ৩ মাস পর পর আপনার মোবাইলে (বিকাশ বা নগদে) বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট ২,৫৫০ টাকা জমা হবে।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এই টাকা ক্যাশ-আউট করার সময় সরকার নির্ধারিত ‘ক্যাশ-আউট চার্জ’ ভাতার টাকার সাথেই পাঠিয়ে দেয়, যাতে আপনার পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ না হয়।

FAQ: প্রতিবন্ধী ভাতা অনলাইন আবেদন

১. অনলাইনে আবেদন করলেই কি আমি ভাতা পাব?

না, অনলাইন আবেদনটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র। আবেদনের পর আপনার তথ্যগুলো স্থানীয় সমাজসেবা কমিটি যাচাই-বাছাই করবে।

২. আমার ‘সুবর্ণ কার্ড’ নেই, আমি কি ভাতার আবেদন করতে পারব?

না। অনলাইন ফরমে আপনার ডিআইএস (DIS) নম্বর দিতে হয়, যা সুবর্ণ কার্ড ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়।

৩. আবেদন করতে কত টাকা খরচ হয়?

সরকারিভাবে এই আবেদন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যায়

৪. আমি কি বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা পাব?

হ্যাঁ। আবেদনের সময় আপনি যদি আপনার সচল বিকাশ বা নগদ নম্বর প্রদান করেন, তবে ‘জিটুপি’ (G2P) পদ্ধতিতে সরাসরি আপনার মোবাইলে টাকা চলে আসবে।

৫. আবেদনের কতদিন পর টাকা পাওয়া শুরু হয়?

এটি নির্ভর করে আপনার এলাকার সমাজসেবা অফিসের যাচাই-বাছাই এবং কোটার ওপর।

উপসংহার – প্রতিবন্ধী ভাতা অনলাইন আবেদন

পরিশেষে বলা যায়, প্রতিবন্ধী ভাতা কেবল একটি আর্থিক সহায়তা নয়, এটি সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও স্বীকৃতির বহিঃপ্রকাশ।

প্রযুক্তির কল্যাণে এখন এই ভাতার আবেদন প্রক্রিয়া অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং হয়রানিমুক্ত হয়েছে।

সামান্য সচেতনতা এবং সঠিক নিয়ম মেনে অনলাইনে আবেদন করলে একজন প্রকৃত অভাবী মানুষ এই সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।

আপনি যদি নিজে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হন অথবা আপনার আশেপাশে এমন কেউ থাকেন, তবে আর দেরি না করে দ্রুত অনলাইনে আবেদনটি সম্পন্ন করুন।

মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে তথ্য প্রদান এবং যথাযথ কাগজপত্র জমা দেওয়াই হলো এই সুবিধা পাওয়ার মূল চাবিকাঠি।

আমাদের সম্মিলিত সচেতনতাই পারে সমাজের অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীর জীবনকে একটু সহজ ও সুন্দর করতে।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন