নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধানে বিটিআরসির নতুন উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের দীর্ঘদিনের ইনডোর কভারেজ সমস্যা ও কল ড্রপ নিরসনে ইজিএসএম (EGSM) ব্যান্ড ব্যবহারের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
এই নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ৮৮০-৮৯০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মূলত ঘরের গভীরতম স্থানেও শক্তিশালী সিগন্যাল পৌঁছে দেওয়াই এই বিশেষ উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।
এই ব্লগে আমরা আলোচনা করব কীভাবে এই স্পেকট্রাম আমাদের দৈনন্দিন যোগাযোগের অভিজ্ঞতাকে বদলে দেবে।
সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপটি স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এবং টেলিকম সেবার মানোন্নয়নে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মোবাইল নেটওয়ার্ক।
কিন্তু অনেক সময় ইনডোর বা ঘরের ভেতর নেটওয়ার্ক না পাওয়া কিংবা ঘনঘন কল ড্রপ হওয়া আমাদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গ্রাহকদের এই ভোগান্তি কমাতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে— EGSM ৮৮০-৮৯০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া।
ইজিএসএম (EGSM) কী?
ইজিএসএম বা Extended Global System for Mobile Communications হলো একটি স্পেকট্রাম ব্যান্ড যা মূলত বিদ্যমান ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের একটি বর্ধিত অংশ।
সাধারণ ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের বাইরেও অতিরিক্ত কিছু তরঙ্গ ব্যবহারের সুযোগ দেয় এই প্রযুক্তি।
কেন এই উদ্যোগ?
বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরগুলো মূলত ১৮০০, ২১০০ এবং ২৩০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড ব্যবহার করে।
কিন্তু উচ্চ কম্পাঙ্কের (Higher Frequency) এই ব্যান্ডগুলোর একটি সীমাবদ্ধতা হলো—এগুলো দেয়াল ভেদ করে ঘরের ভেতরে খুব ভালো সার্ভিস দিতে পারে না।
অন্যদিকে, ৯০০ মেগাহার্টজ বা ইজিএসএম-এর মতো নিম্ন কম্পাঙ্কের (Lower Frequency) তরঙ্গ খুব সহজে দেয়াল ভেদ করে ইনডোর কভারেজ নিশ্চিত করতে পারে।
বিটিআরসির পরিকল্পনা
বিটিআরসি এই ইজিএসএম ব্যান্ডকে ছোট ছোট ব্লকে ভাগ করে মোবাইল অপারেটরদের দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
এর ফলে অপারেটররা তাদের বিদ্যমান নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ব্যবহার করেই সেবার মান অনেকখানি বাড়িয়ে নিতে পারবে।
বিশেষ করে শহর অঞ্চলে যেখানে নেটওয়ার্কের ওপর অনেক চাপ থাকে, সেখানে এই উদ্যোগটি গেম চেঞ্জার হতে পারে।
মোবাইল অপারেটররা কি বলেছেন – নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধানে বিটিআরসির উদ্যোগ
বিটিআরসির ইজিএসএম (EGSM) ব্যান্ড ব্যবহারের এই উদ্যোগকে রবি এবং বাংলালিংকের মতো অপারেটররা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে এবং তারা দ্রুত এই তরঙ্গ বরাদ্দের জন্য আবেদন জানিয়েছে।
অপারেটরদের মতে, ৮৮০-৮৯০ মেগাহার্টজের মতো নিম্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শক্তিশালী ইনডোর কভারেজ নিশ্চিত করতে এবং কল ড্রপ কমাতে গেম চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে।
তারা বিটিআরসিকে অনুরোধ করেছে যাতে তরঙ্গ বরাদ্দের প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হয়, যেন বাজারে সব অপারেটরের জন্য সমান সুযোগ বজায় থাকে।
রবি ও বাংলালিংক এরই মধ্যে ৩.৪ মেগাহার্টজ করে স্পেকট্রাম ব্যবহারের আগ্রহ দেখিয়েছে এবং কারিগরি ট্রায়াল শেষে দ্রুত বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মূলত বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই সেবার মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব বলে অপারেটররা বিটিআরসিকে আশ্বস্ত করেছে।
নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধানে বিটিআরসির উদ্যোগ – কি কি সুবিধা হবে
ইজিএসএম (EGSM) ব্যান্ড ব্যবহারের মাধ্যমে মোবাইল অপারেটররা কম শক্তিশালী টাওয়ার দিয়েই বিশাল এলাকা কভারেজের আওতায় আনতে পারবে।
এটি মূলত তরঙ্গের গভীরতা বাড়িয়ে ঘরের অভ্যন্তরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্কের মানকে আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল করবে।
এর প্রধান সুবিধাগুলো হলো:
- শক্তিশালী ইনডোর কভারেজ: নিম্ন কম্পাঙ্কের কারণে এই তরঙ্গ খুব সহজেই দালানের দেয়াল ভেদ করে ঘরের ভেতরে পৌঁছাতে পারে।
- কল ড্রপ হ্রাস: সিগন্যাল স্ট্রেংথ বেশি থাকায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হুটহাট কল কেটে যাওয়ার সমস্যা দূর হবে।
- সাশ্রয়ী অবকাঠামো: একটি বেস স্টেশন বা টাওয়ার ব্যবহার করেই অনেক বেশি এলাকা নেটওয়ার্ক সেবার আওতায় আনা সম্ভব।
- ভয়েস কোয়ালিটির উন্নতি: তরঙ্গের জট কম থাকার কারণে গ্রাহকরা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং স্পষ্ট শব্দ শুনতে পাবেন।
- দ্রুত ডেটা সংযোগ: নেটওয়ার্কের গভীরতা বাড়ার ফলে ভবনের ভেতর বা বেজমেন্টেও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাবে।
- সীমান্তবর্তী নেটওয়ার্ক উন্নয়ন: এই ব্যান্ড ব্যবহারের ফলে বর্ডার এলাকায় নেটওয়ার্ক সিগন্যাল ওভারল্যাপ বা জটলা হওয়ার ঝুঁকি কমে আসবে।
বিটিআরসি কবে এই সেবা চালু করবে?
বিটিআরসি ইতোমধ্যে ইজিএসএম (EGSM) ব্যান্ড বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং এর সফল বাস্তবায়নে এক মাসের একটি পরীক্ষামূলক ট্রায়াল চালু করা হয়েছে।
এই ট্রায়াল পিরিয়ডে সীমান্ত এলাকায় সিগন্যাল হস্তক্ষেপ বা কারিগরি কোনো সমস্যা হয় কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এবং অপারেটরদের সাথে বরাদ্দ সংক্রান্ত চূড়ান্ত আলোচনা শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।
রবি ও বাংলালিংকের মতো অপারেটররা যেহেতু দ্রুত বরাদ্দ পেতে আগ্রহী, তাই ধারণা করা হচ্ছে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই গ্রাহকরা এর সুফল পেতে শুরু করবেন।
মূলত কল ড্রপ কমানো এবং ইনডোর নেটওয়ার্কের মানোন্নয়নে এটি বিটিআরসির একটি অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প হিসেবে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
FAQ: নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধানে বিটিআরসির উদ্যোগ
১. ইজিএসএম (EGSM) আসলে কী?
ইজিএসএম হলো মোবাইল যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত একটি বিশেষ রেডিও তরঙ্গ, যা মূলত বিদ্যমান ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের একটি বর্ধিত অংশ এবং এটি দেয়াল ভেদ করে ভেতরে পৌঁছাতে অত্যন্ত কার্যকর।
২. এটি চালু হলে সাধারণ গ্রাহকের লাভ কী?
এর ফলে লিফট, বেজমেন্ট বা ঘরের একদম ভেতরের রুমেও মোবাইলে পূর্ণ নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে এবং কল ড্রপের সমস্যা নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।
৩. এই সুবিধা পেতে কি নতুন সিম বা ফোন কিনতে হবে?
না, বর্তমানে বাজারে থাকা প্রায় সব স্মার্টফোন এবং সাধারণ সিম কার্ডই এই ইজিএসএম ব্যান্ড সাপোর্ট করে।
তাই আপনাকে অতিরিক্ত কিছু কিনতে হবে না।
৪. অপারেটররা কেন এই ব্যান্ড নিতে আগ্রহী?
এই ব্যান্ডের তরঙ্গ অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। যার ফলে অপারেটররা কম টাওয়ার বসিয়েও অনেক বড় এলাকায় শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সেবা দিতে পারে।
৫. বিটিআরসি কেন এটি সরাসরি বরাদ্দ না দিয়ে ট্রায়াল দিচ্ছে?
ভারতের সীমান্ত এলাকায় যাতে আমাদের এই তরঙ্গের কারণে কোনো সিগন্যাল জট বা ইন্টারফারেন্স তৈরি না হয়, সেটি নিশ্চিত করতেই বিটিআরসি এক মাসের পরীক্ষামূলক ট্রায়াল পরিচালনা করছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বিটিআরসির এই ইজিএসএম ব্যান্ড ব্যবহারের উদ্যোগ দেশের টেলিকম খাতের জন্য একটি বড় আশার আলো।
ইনডোর কভারেজের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করে গ্রাহকদের উন্নত ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়াই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
অপারেটরদের তরফ থেকে পাওয়া ইতিবাচক সাড়া এবং বিটিআরসির কারিগরি ট্রায়াল সফল হলে খুব দ্রুতই আমরা একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করব।
সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি কল ড্রপ কমিয়ে আমাদের ডিজিটাল জীবনযাত্রাকে আরও গতিশীল ও সহজতর করে তুলবে।
মূলত উন্নত সেবার মাধ্যমে গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জন করাই হবে এই উদ্যোগের চূড়ান্ত সফলতা।
তথ্যসূত্রঃ
বিটিআরসির (BTRC) অফিসিয়াল ঘোষণা এবং দেশের প্রধান দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।


