দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে নীতিগতভাবে এগোচ্ছে সরকার।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় যে অভূতপূর্ব জোয়ার এসেছে, তা আমরা সবাই দেখছি।

তবে আনন্দের খবর এখানেই শেষ নয়।

এবার দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ এবং শক্তিশালী করতে সরকার দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য নীতিগতভাবে এগিয়ে চলেছে।

ইতোমধ্যে এই মেগা প্রজেক্টের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে।

সম্প্রতি ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিতকরণের এক প্রস্তুতি সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব কেন এই দ্বিতীয় পদ্মা সেতু দেশের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় কী কী বিষয় উঠে এসেছে।

পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট ও বিশ্লেষকদের মতে, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহের অন্যতম একটি লাইফলাইন।

প্রথম পদ্মা সেতু মূলত মাওয়া-জাজিরা পয়েন্ট দিয়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করেছে।

দ্বিতীয় পদ্মা সেতু

কিন্তু কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, রাজবাড়ী এবং পাবনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বিশাল অংশের মানুষের ঢাকার সাথে দ্রুত যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এখনো এই দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুট।

বছরের পর বছর ধরে এই রুটে ফেরি পারাপারের জন্য যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

এমনকি দিন পার করতে হয়েছে।

এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে:

১. ফেরি ঘাটের দীর্ঘ যানজট এবং ভোগান্তির অবসান ঘটবে।

২. দেশের পুরো সড়ক নেটওয়ার্কে একটি চমৎকার ভারসাম্য আসবে। যা একটি অঞ্চলের ওপর বাড়তি যানবাহনের চাপ কমাবে।

দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় কী কী বিষয় উঠে এসেছে?

একটি সেতু শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়, এর পেছনে থাকে বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত হিসাব-নিকাশ।

সরকারি সূত্র অনুযায়ী, সম্পন্ন হওয়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে:

উপযুক্ত রুট নির্ধারণ:

নদীর গতিপ্রকৃতি এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে কোন স্থানে সেতুটি নির্মাণ করলে খরচ সবচেয়ে কম হবে এবং সুফল মিলবে তা ঠিক করা হয়েছে।

যানবাহনের ভবিষ্যৎ চাপ:

আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরে এই রুটে কী পরিমাণ গাড়ি চলাচল করতে পারে এবং সেতুটি সেই চাপ সামলাতে পারবে কি না তা যাচাই করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক সুফল ও লাভ:

সেতুটি চালু হলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কেমন হবে, আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্যের কতটা প্রসার ঘটবে এবং বিনিয়োগের টাকা কত দ্রুত উঠে আসবে তা মূল্যায়ন করা হয়েছে।

কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা:

পদ্মার মতো প্রমত্তা নদীর তলদেশের মাটি, পানির তীব্র প্রবাহ এবং ভূমিকম্প সহনশীলতার বিষয়টি মাথায় রেখে কেমন প্রযুক্তির পাইলিং প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নতুন গতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম পদ্মা সেতুর সাফল্যের পর দ্বিতীয় সেতুটি এর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।

নতুন এই সেতুটি চালু হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি, শিল্প ও পর্যটন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

এটি নির্মিত হলে মোংলা ও পায়রা বন্দরের কাজের গতি এবং কার্যকারিতা আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে।

ঢাকার সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পাঞ্চলগুলোর সরাসরি এবং দ্রুত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হবে।

সহজে কাঁচামাল পরিবহনের সুবিধা থাকায় এই অঞ্চলে দ্রুত নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠবে।

যোগাযোগের এই অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে স্থানীয় মানুষের জন্য লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

শেষ কথা

দ্বিতীয় পদ্মা সেতু কেবল কোনো অবকাঠামো নয়, এটি কোটি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির একটি নতুন সেতু বন্ধন।

সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়া দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে এক বিশাল মাইলফলক।

প্রথম পদ্মা সেতুর মতো এই প্রকল্পটিও দেশের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

এই সেতুটি চালু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর ভাগ্য পুরোপুরি বদলে যাবে।

আমরা আশা করতে পারি, খুব দ্রুতই এই স্বপ্নের মেগা প্রকল্পের দৃশ্যমান মূল কাজ শুরু হবে।

তথ্যসূত্র: সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের প্রেস ব্রিফিং এবং সাম্প্রতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন।