ঢাকায় জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রবর্তন রাজধানীর যানজট জটলা নিরসনে এক ঐতিহাসিক এবং বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে।

উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিম বরাবর প্রায় ১০৫ কিলোমিটার সড়ককে একটি আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত করার এই মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

এই বিশেষ নেটওয়ার্কের আওতাধীন সড়কগুলোতে কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল বা মোড়ে থামার ঝামেলা থাকবে না।

ফলে যানবাহনগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচল করতে পারবে।

মূলত উড়ালসড়ক, আন্ডারপাস ও আধুনিক ইন্টারচেঞ্জ নির্মাণের মাধ্যমে যানজটের চিরচেনা ভোগান্তি দূর করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

এই যুগান্তকারী উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থায় এক নতুন গতির সঞ্চার হবে এবং নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে।

বর্তমানে ঢাকার যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে দীর্ঘ সময় থমকে থাকা।

জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক

ইন্টারসেকশন বা চৌরাস্তাগুলোতে সিগন্যালের কারণে গাড়ির গতি ধীর হয়ে যায় এবং পেছনে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়।

১. অর্থনৈতিক ক্ষতি হ্রাস:

যানজটের কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি নষ্ট হচ্ছে।

এই এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক চালু হলে এই বিশাল অর্থনৈতিক অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে।

২. নির্বিঘ্ন যাতায়াত:

কোনো সিগন্যাল ছাড়াই শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য এই প্রকল্প অত্যন্ত জরুরি।

৩. যানবাহনের গতি বৃদ্ধি:

ঢাকার অভ্যন্তরীণ সড়কে যানবাহনের গড় গতি বর্তমানে প্রায় হাঁটার গতির কাছাকাছি নেমে এসেছে।

এই প্রকল্প গাড়ির স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন গতি নিশ্চিত করবে।

কীভাবে কাজ করবে জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ব্যবস্থা?

‘জিরো সিগন্যাল’ বা ট্রাফিক সিগন্যালমুক্ত ব্যবস্থার মূল ধারণাই হলো—মূল সড়কে চলাচলকারী কোনো যানবাহনকে অন্য কোনো সড়কের গাড়ির ক্রসিংয়ের জন্য মোড়ে থামতে হবে না।

১. গ্রেড সেপারেশন (Grade Separation):

এই ব্যবস্থায় ইন্টারসেকশন বা মোড়গুলোতে কোনো গাড়ি একে অপরকে ক্রস করবে না।

মূল এক্সপ্রেসওয়ের গাড়িগুলো সরাসরি ওপর দিয়ে (Flyover) অথবা নিচ দিয়ে (Underpass) চলে যাবে।

২. নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ও বাহির (Controlled Access):

এক্সপ্রেসওয়েতে যত্রতত্র গাড়ি প্রবেশ করতে বা বের হতে পারবে না।

নির্দিষ্ট কিছু র্যাম্প (Ramp) বা লুপের মাধ্যমে গাড়ি এই নেটওয়ার্কে উঠবে এবং নামবে।

৩. ইন্টারচেঞ্জ ব্যবহার:

চৌরাস্তাগুলোতে আধুনিক ইন্টারচেঞ্জ তৈরি করা হবে, যাতে কোনো গাড়ি ডান বা বামে মোড় নিতে চাইলে মূল সড়কের ট্রাফিক প্রবাহে কোনো বাধা না তৈরি করে লেন পরিবর্তন করতে পারে।

যেসব অবকাঠামো তৈরি হবে

মেগাসিটি ঢাকার যানজট নিত্যদিনের এক চরম বাস্তবতার নাম।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকা, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং জ্বালানির অপচয়, সব মিলিয়ে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ে দুর্ভোগের শেষ নেই।

এই চিরচেনা যানজটের চিত্র বদলে দিতে এবার এক মেগা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

১০৫ কিলোমিটারের এই বিশাল নেটওয়ার্ককে সিগন্যালমুক্ত করতে বেশ কিছু আধুনিক ও মেগা অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে:

১. উড়ালসড়ক ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে:

নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশজুড়ে থাকবে ফ্লাইওভার বা উড়ালসড়ক, যাতে নিচের সাধারণ ট্রাফিকের সাথে এর কোনো সংঘর্ষ না হয়।

২. আন্ডারপাস এবং ওভারপাস:

পথচারী পারাপার এবং ইউ-টার্নের জন্য আধুনিক আন্ডারপাস ও ওভারপাস তৈরি করা হবে, যাতে মূল সড়কের গতি ব্যাহত না হয়।

৩. ডিরেকশনাল র‍্যাম্প:

এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি ওঠা এবং নামার জন্য বিশেষ নকশার র‍্যাম্প ও লুপ তৈরি করা হবে।

যেসব লোকেশনে যুক্ত হবে এই জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক প্রকল্প

প্রাথমিক পরিকল্পনা ও রুট এলাইনমেন্ট অনুযায়ী, এই ১০৫ কিলোমিটারের এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক রাজধানীর প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক ও আবাসিক অঞ্চলকে সংযুক্ত করবে:

১. উত্তর-দক্ষিণ করিডোর:

উত্তরা, এয়ারপোর্ট, খিলক্ষেত, কুড়িল, বাড্ডা, রামপুরা, সায়েদাবাদ হয়ে যাত্রাবাড়ী এবং পোস্তগোলা/নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড পর্যন্ত।

২. পূর্ব-পশ্চিম করিডোর:

গাবতলী, মিরপুর, কালশী, বনানী, প্রগতি সরণি হয়ে পূর্বাচল ৩শ ফিট সড়ক এবং অন্যদিকে কাঁচপুর/ডেমরা রুটের সংযোগ।

৩. সমন্বিত রুট:

ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার সড়ক (Circular Road) এবং অভ্যন্তরীণ প্রধান মহাসড়কগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশকে এই ১০৫ কিলোমিটারের মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা?

প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীদের মতে, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করার জন্য এটি একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেগা সিটিগুলোতে সিগন্যালমুক্ত এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

তবে এই প্রকল্প সফল করতে হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না।

এর পাশাপাশি এক্সপ্রেসওয়েতে ধীরগতির যানবাহন (যেমন- রিকশা বা ভ্যান) প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

একই সাথে ঢাকার প্রবেশদ্বারগুলোর সাথে এর নিখুঁত সংযোগ স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।

যাতে ঢাকার বাইরে থেকে আসা দূরপাল্লার গাড়িগুলো সরাসরি এই নেটওয়ার্কের সুবিধা নিয়ে দ্রুত পার হয়ে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো আশা করছে, এই প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াতের সময় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসবে।

যা নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

উপসংহার – ঢাকায় জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক

১০৫ কিলোমিটারের এই সিগন্যালমুক্ত এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক ঢাকার যানজট সমস্যা সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত কার্যকরী মহৎ উদ্যোগ।

‘জিরো সিগন্যাল’ ব্যবস্থাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু যে নগরবাসীর যাতায়াতের সময় ও ভোগান্তি কমবে তা নয়।

বরং দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

তবে এই মেগা প্রকল্পের সুফল পুরোপুরি পেতে হলে সময়মতো নির্মাণকাজ শেষ করার পাশাপাশি ধীরগতির যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

আধুনিক ও গতিশীল এক নতুন ঢাকা বিনির্মাণে এই প্রকল্প নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।