আসন্ন পবিত্র রমজান উপলক্ষে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (TCB)।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে দেশের ৩৫ লক্ষ পরিবারকে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার এক বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
পবিত্র রমজান মাস মানেই সংযম এবং ত্যাগের মাস। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য রমজান মাসে বাজারদরের সাথে পাল্লা দেওয়াটা মাঝেমধ্যেই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।
সাধারণ মানুষের এই কষ্ট লাঘব করতে সরকার এই বছর এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে টিসিবির এই উদ্যোগ কেবল একটি সহায়তা নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তির এক পরম আশ্বাস। তেল, ডাল, চিনি থেকে শুরু করে ইফতারের প্রয়োজনীয় ছোলা ও খেজুর সবই মিলবে সাশ্রয়ী মূল্যে।
আজকের ব্লগে আমরা জানবো, আপনার এলাকায় কবে ও কোথায় পাওয়া যাবে এই সাশ্রয়ী পন্য। আর কি কি নতুন পন্য যুক্ত করা হয়েছে।
পবিত্র রমজান মাস আমাদের সামনে বয়ে নিয়ে আসে রহমত ও বরকতের বার্তা।
তবে উৎসব আর ইবাদতের এই মাসে সাধারণ মানুষের জন্য অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম।
মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের সেই উদ্বেগ দূর করতে এবং পবিত্র মাসের আনন্দকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে সরকার গ্রহণ করেছে এক বিশাল কর্মপরিকল্পনা।
পবিত্র রমজান উপলক্ষে ৩৫ লক্ষ পরিবারের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার এই বিশেষ কার্যক্রমটি ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশব্যাপী শুরু হয়েছে।
এই কার্যক্রমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো-
উদ্বোধন:
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় এই ভ্রাম্যমাণ ট্রাক সেল (Truck Sale) কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন।
সময়সীমা:
এই বিশেষ বিক্রয় কার্যক্রম ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত মোট ২০ দিন চলবে (শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত)।
ভোক্তার সংখ্যা:
ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে সারা দেশের প্রায় ৩৫ লক্ষ সাধারণ ভোক্তা এই সুবিধা পাবেন।
টিসিবি পন্যের ট্রাকসেল বরাদ্দের তালিকা
পবিত্র রমজান উপলক্ষে টিসিবির ট্রাকসেল কার্যক্রমটি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ থেকে দেশব্যাপী শুরু হয়েছে।
এই কার্যক্রমটি মূলত নিম্নআয়ের মানুষ এবং সাধারণ ক্রেতাদের স্বস্তি দিতে ডিজাইন করা হয়েছে।
নিচে জেলাভিত্তিক ট্রাক সংখ্যা ও সময়সূচীর বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো:
কবে ও কখন ট্রাকসেল থাকবে?
- এই বিশেষ কার্যক্রমটি ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ১২ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত চলবে।
- সপ্তাহে মোট ৬ দিন (শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত) ট্রাকসেল চলবে।
- সাধারণত সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে পণ্য শেষ হওয়া পর্যন্ত এই বিক্রয় কার্যক্রম চলে।
সারা দেশে মোট ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে এই পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। বণ্টনের হিসাবটি নিম্নরূপ:
- ঢাকা মহানগরী – ৫০টি ট্রাক
- চট্টগ্রাম মহানগরী – ২০টি ট্রাক
- অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন (৭টি শহর) – প্রতিটিতে ১৫টি করে ট্রাক (যেমন: খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুর ইত্যাদি)
- অবশিষ্ট ৫৫টি – জেলাপ্রতিটি জেলা শহরে ৫টি করে ট্রাক
ট্রাকসেলে কি পন্য দেওয়া হবে ও তাদের দাম
পবিত্র রমজান উপলক্ষে টিসিবির ট্রাকসেল কার্যক্রমে মূলত ইফতার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ৫টি পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
এই কার্যক্রমে কোনো কার্ড ছাড়াই সাধারণ মানুষ নির্ধারিত মূল্যে পণ্য কিনতে পারছেন।
ট্রাকসেলে বিক্রয়কৃত পণ্যের তালিকা ও মূল্য
- ভোজ্য তেল (সয়াবিন) – ১১৫ টাকা (লিটার) – ২ লিটার
- মসুর ডাল – ৭০ টাকা (কেজি) – ২ কেজি
- চিনি – ৮০ টাকা (কেজি) – ১ কেজি
- ছোলা – ৬০ টাকা (কেজি) – ১ কেজি
- খেজুর – ১৬০ টাকা (৫০০ গ্রাম) – ৫০০ গ্রাম (১ প্যাকেট)
কিছু গুরত্বপূর্ণ তথ্য:
এই ট্রাকসেলে পন্য নিতে কোনো কার্ড লাগবে না।
প্রতিটি ট্রাকে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ জনের জন্য পণ্য থাকে। তাই সাধারণত লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য সংগ্রহ করতে হয়।
শুক্রবার এবং অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে ট্রাকসেল বন্ধ থাকে।
ট্রাকসেলে টিসিবি পন্য নিতে কিছু গুরত্বপূর্ণ বিষয়
বাজারের বর্তমান দরের তুলনায় টিসিবির পণ্যের দাম প্রায় ৩০-৪০% কম। উদাহরণস্বরূপ, বাজারে যেখানে এক লিটার সয়াবিন তেল ১৮০-১৯৫ টাকা, সেখানে টিসিবির ট্রাকে তা মাত্র ১১৫ টাকা।
এই সাশ্রয় একটি সাধারণ পরিবারের মাসের বাজেটে বড় প্রভাব ফেলে। আপনাকে যে বিষয় গুলি মনে রাখতে হবে-
সময়মতো যাওয়া:
সকাল ১০টায় বিক্রি শুরু হলেও লাইনে দাঁড়ানোর জন্য ৯টা বা ৯:৩০টার মধ্যে স্পটে পৌঁছানো ভালো।
খুচরা টাকা রাখা:
দ্রুত লেনদেনের জন্য সাথে খুচরা টাকা (যেমন: ৫, ১০ বা ২০ টাকার নোট) রাখা সুবিধাজনক।
পরিচয়পত্র রাখা:
যদিও কার্ড লাগে না, তবে অনেক সময় শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) সাথে রাখা নিরাপদ।
অতিরিক্ত কেনাকাটা না করা:
অন্যকে সুযোগ দিতে একজনের অতিরিক্ত পণ্য না কেনা।
অনিয়ম দেখলে অভিযোগ:
যদি কোনো ডিলার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম রাখে বা ওজনে কম দেয়, তবে স্থানীয় প্রশাসন বা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দিতে পারেন।
FAQ:সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবি পন্য
১. এই ট্রাকসেল থেকে পণ্য কিনতে কি ফ্যামিলি কার্ড লাগবে?
না। ৩৫ লক্ষ পরিবারের জন্য আয়োজিত এই বিশেষ ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেল কার্যক্রমটি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য উন্মুক্ত।
এখানে পণ্য কিনতে কোনো টিসিবি ফ্যামিলি কার্ডের প্রয়োজন নেই।
২. একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ কতটুকু পণ্য কিনতে পারবেন?
একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ ২ লিটার সয়াবিন তেল, ২ কেজি মসুর ডাল, ১ কেজি চিনি, ১ কেজি ছোলা এবং ৫০০ গ্রাম খেজুর কিনতে পারবেন।
৩. ট্রাকসেল কি প্রতিদিন চলে?
এই কার্যক্রম ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত চলবে। তবে শুক্রবার এবং অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে ট্রাকসেল বন্ধ থাকে।
৪. আমার এলাকায় ট্রাক কখন আসবে কীভাবে জানবো?
সাধারণত জেলা প্রশাসন বা সিটি কর্পোরেশন প্রতিদিনের পয়েন্টগুলো নির্ধারণ করে।
আপনার নিকটস্থ ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিস বা স্থানীয় বাজার কমিটির কাছ থেকে ট্রাকের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন।
এছাড়া জনাকীর্ণ মোড় বা বাজারের আশেপাশে সকাল ১০টার পর খোঁজ নিতে পারেন।
5. পণ্যের দাম কি বাজারের চেয়ে অনেক কম?
হ্যাঁ, বাজারের তুলনায় টিসিবির পণ্যের দাম প্রায় ৩০% থেকে ৪০% পর্যন্ত কম।
উপসংহার – সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবি পন্য
পরিশেষে বলা যায়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই কঠিন সময়ে ৩৫ লক্ষ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর এই সরকারি উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
টিসিবির এই সাশ্রয়ী পণ্য সাধারণ মানুষের ইফতার ও সেহরির আয়োজনকে যেমন সহজ করবে, তেমনি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি কারীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সফলতা কেবল সরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে না।
বরং আমাদের সচেতনতাও এখানে জরুরি। লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য সংগ্রহের সময় ধৈর্য বজায় রাখা এবং অন্যকে সুযোগ করে দেওয়ার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।
এছাড়া, বাজার মনিটরিং এবং সঠিক তদারকির মাধ্যমে যদি এই পণ্যগুলো প্রকৃত হকদারদের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করা যায়। তবেই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য সফল হবে।


