বাংলাদেশে খুব তাড়াতাড়ি চালু হবে কৃষক কার্ড ।

এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন আমাদের ঘামঝরানো কৃষকরা।

কিন্তু আধুনিক যুগেও অনেক ক্ষেত্রে কৃষকরা তাঁদের প্রাপ্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা, ভর্তুকি কিংবা ঋণ পেতে নানা বিড়ম্বনার শিকার হন।

এই চিত্র বদলে দিতে এবং কৃষকদের জীবনমান ডিজিটাল পদ্ধতিতে সহজতর করতে সরকার নিয়ে আসছে এক যুগান্তকারী সমাধান কৃষক কার্ড।

সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এই কার্ডের গুরুত্ব তুলে ধরে জানিয়েছেন, এটি কেবল একটি পরিচয়পত্র নয়, বরং এটি হবে কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নের চাবিকাঠি।

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এই ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকের সাথে রাষ্ট্রের সরাসরি সেতুবন্ধন তৈরি হতে যাচ্ছে।

আজকের ব্লগে আমরা জানব, এই বহুল প্রতীক্ষিত কৃষক কার্ড আসলে কী এবং এটি কীভাবে আমাদের কৃষকদের ভাগ্য বদলে দেবে।

কৃষক কার্ড হলো একজন কৃষকের জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র বা স্মার্ট আইডি কার্ড।

এটি মূলত টিসিবির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা আমাদের ‘স্মার্ট এনআইডি’ কার্ডের মতোই একটি উন্নত সংস্করণ, যা শুধুমাত্র কৃষিকাজের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে।

কৃষক কার্ড

এই কার্ডের মাধ্যমে সরকার নিশ্চিত করবে যে, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাগুলো সরাসরি প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে।

এতে কৃষকের নাম, জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

কৃষক কার্ড এর সুবিধা গুলি কি কি?

কৃষক কার্ডের সুবিধাগুলোকে যদি আমরা এক কথায় বলি, তবে এটি একজন কৃষকের জন্য ‘সব মুশকিলের আসান’।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন যে আধুনিক ও ডিজিটাল কৃষিব্যবস্থার কথা বলেছেন, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা মূলত নিচের ৫টি প্রধান সুবিধা পাবেন:

১. সরাসরি আর্থিক অনুদান

আগে সরকারি অনুদান বা খরা-বন্যার ক্ষতিপূরণ পেতে অনেক সময় দেরি হতো বা মাঝপথে টাকা চুরির ভয় থাকত।

এখন কৃষক কার্ডের সাথে কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ) যুক্ত থাকবে।

ফলে সরকারের পাঠানো টাকা সরাসরি আপনার মোবাইলে চলে আসবে।

২. সার ও বীজে বিশেষ ছাড়

বাজারে সারের দাম বাড়লেও কার্ডধারী কৃষকরা সরকার নির্ধারিত সুলভ মূল্যে সার, বীজ এবং কীটনাশক কিনতে পারবেন।

ডিলারের কাছে কার্ড দেখালে আপনি আপনার বরাদ্দকৃত অংশটি সহজেই বুঝে পাবেন।

৩. সহজ শর্তে কৃষি ঋণ

ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে আগে অনেক কাগজপত্রের ঝামেলা পোহাতে হতো।

কৃষক কার্ড থাকলে ব্যাংক সহজেই বুঝতে পারবে আপনি একজন প্রকৃত কৃষক।

এতে করে জামানত ছাড়াই বা নামমাত্র সুদে দ্রুত ঋণ পাওয়া সম্ভব হবে।

৪. সরাসরি ধান-চাল বিক্রয়

ফসল কাটার পর কৃষকরা প্রায়ই ন্যায্য মূল্য পান না কারণ মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে কিনে নেয়।

এই কার্ড থাকলে আপনি সরাসরি সরকারি গুদামে আপনার উৎপাদিত ধান বা গম বিক্রি করতে পারবেন, ফলে আপনার পকেটে পুরো টাকাটাই আসবে।

৫. স্মার্ট কৃষি পরামর্শ ও তথ্য

কার্ডের ডিজিটাল ডাটাবেসের মাধ্যমে কৃষি কর্মকর্তারা জানতে পারবেন আপনার জমিতে কী চাষ হচ্ছে। যার ফলে:

  • আপনার ফসলে কোনো রোগ হলে মোবাইলে সমাধান পাবেন।
  • আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা সরাসরি আপনার কাছে পৌঁছাবে।
  • কোন জমিতে কোন সার কতটুকু দিতে হবে, তার ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন পাবেন।

কিভাবে এই কার্ড পাওয়া যাবে

কৃষক কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সরকার অত্যন্ত সহজ করার চেষ্টা করছে যাতে প্রান্তিক কৃষকরা কোনো ভোগান্তি ছাড়াই এটি সংগ্রহ করতে পারেন।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই কার্ড পাওয়ার ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ

আবেদন করার আগে নিচের কাগজগুলো লাগবে-

  • আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর ফটোকপি।
  • সাম্প্রতিক তোলা ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
  • নিজের জমি হলে খতিয়ান/পর্চা বা দাখিল
  • যদি নিজের জমি না থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা মেম্বারের প্রত্যয়নপত্র (যেখানে উল্লেখ থাকবে আপনি ওই জমিতে চাষাবাদ করছেন)।
  • একটি সচল মোবাইল নম্বর (যা আপনার NID দিয়ে রেজিষ্ট্রেশন করা)।

২. কোথায় যোগাযোগ করতে হবে?

এই কার্ড পাওয়ার জন্য আপনাকে মূলত তিনটি জায়গার যেকোনো একটিতে যোগাযোগ করতে হবে:

ইউনিয়ন কৃষি সহকারী (BS):

প্রতি ইউনিয়নে সরকারি কৃষি ব্লক সুপারভাইজার বা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা থাকেন।

তাদের কাছেই প্রাথমিক তালিকা তৈরির দায়িত্ব থাকে।

উপজেলা কৃষি অফিস:

আপনি সরাসরি আপনার উপজেলার কৃষি অফিসে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন।

ডিজিটাল সেন্টার:

ইউনিয়ন পরিষদে অবস্থিত ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তারাও অনেক সময় এই নিবন্ধনে সহায়তা করেন।

৩. নিবন্ধনের ধাপসমূহ

তালিকাভুক্তি:

প্রথমে কৃষি অফিসের প্রতিনিধিরা আপনার বাড়ি বা জমিতে গিয়ে আপনার তথ্য যাচাই করবেন।

ফর্ম পূরণ:

আপনাকে একটি নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করতে হবে যেখানে আপনার জমির পরিমাণ, কী ফসল চাষ করেন এবং পরিবারের তথ্য দিতে হবে।

ডাটাবেস এন্ট্রি:

আপনার তথ্যগুলো সরকারি সার্ভারে আপলোড করা হবে।

কার্ড বিতরণ:

তথ্য যাচাই-বাছাই শেষ হলে আপনাকে একটি স্মার্ট কৃষক কার্ড প্রদান করা হবে।

কবে থেকে কৃষক কার্ড পাওয়া যাবে

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) সচিবালয়ে এক বৈঠকের পর কৃষক কার্ড বিতরণের সময়সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপডেট দিয়েছেন।

মন্ত্রীর বক্তব্য এবং সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্ড পাওয়ার সময়সূচী নিচে দেওয়া হলো:

১. পাইলট প্রজেক্ট (পরীক্ষামূলক শুরু)

মন্ত্রী জানিয়েছেন যে, সরকার খুব শীঘ্রই ‘পাইলট প্রজেক্ট’ বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে এই কার্ড বিতরণ শুরু করতে যাচ্ছে।

এটি প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা বা ইউনিয়নে চালু করা হবে। এর সফলতার ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে কার্ড বিতরণ করা হবে।

২. কবে নাগাদ হাতে পাবেন?

সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট তারিখ মন্ত্রী উল্লেখ করেননি, কারণ এর সাথে অনেক বড় একটি ডাটাবেস তৈরির কাজ জড়িত।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রস্তুতির অনেক বিষয় থাকায় ঠিক কবে থেকে বিতরণ শুরু হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, তবে সরকার এটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

৩. আপনার যা করা উচিত

যেহেতু পাইলট প্রজেক্টের মাধ্যমে কাজ শুরু হচ্ছে, তাই আপনার এলাকায় কবে নাগাদ এটি আসবে তা জানার জন্য:

আপনার এলাকার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার (BS) সাথে যোগাযোগ রাখুন।

ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ বোর্ডে লক্ষ্য রাখুন।

জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং জমির তথ্য হালনাগাদ করে রাখুন যাতে নিবন্ধন শুরু হওয়া মাত্রই আপনি আবেদন করতে পারেন।

FAQ: কৃষক কার্ড

১. কৃষক কার্ড করতে কি কোনো টাকা লাগবে?

না, কৃষক কার্ড সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হবে। এটি সরকারের একটি জনকল্যাণমূলক সেবা।

২. যারা অন্যের জমি বর্গা চাষ করেন, তারা কি এই কার্ড পাবেন?

হ্যাঁ, প্রকৃত চাষি হিসেবে বর্গা চাষিরাও এই কার্ড পাওয়ার যোগ্য। তবে তাদের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে বর্গা চাষের একটি প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হতে পারে।

৩. একটি পরিবারে কি একাধিক ব্যক্তি কার্ড পাবেন?

সাধারণত যার নামে জমি আছে বা যিনি সরাসরি চাষাবাদের সাথে যুক্ত, তাকেই কার্ড দেওয়া হয়।

৪. কার্ড হারিয়ে গেলে কী করণীয়?

কার্ড হারিয়ে গেলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই।

নিকটস্থ কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে অথবা অনলাইনে আপনার নিবন্ধিত নম্বর দিয়ে পুনরায় নতুন কার্ডের জন্য আবেদন করা যাবে।

৫. এই কার্ড দিয়ে কি সব ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যাবে?

উত্তর: মূলত সরকারি ও কৃষি ব্যাংকগুলো এই কার্ডের মাধ্যমে ঋণ প্রদানে অগ্রাধিকার দেবে।

উপসংহার – কৃষক কার্ড

পরিশেষে বলা যায়, কৃষক কার্ড কেবল প্লাস্টিকের একটি টুকরো বা সাধারণ পরিচয়পত্র নয়।

এটি বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনের এক ডিজিটাল হাতিয়ার।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন যেমনটি ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষি খাতে স্বচ্ছতা ফিরবে এবং কৃষকরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির প্রকৃত মর্যাদা পাবেন।

সরকারি ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছানো থেকে শুরু করে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া সবই এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

তাই আধুনিক ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার এই মিছিলে সামিল হতে আপনার এলাকায় কৃষক কার্ডের নিবন্ধন শুরু হওয়া মাত্রই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তৈরি থাকুন।

মনে রাখবেন, সমৃদ্ধ কৃষক মানেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন