বর্তমানে পাসপোর্ট দালাল মুক্ত করতে নতুন পদক্ষেপ আসতে যাচ্ছে।

একটি দেশের নাগরিক হিসেবে বিদেশ ভ্রমণ, উচ্চশিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য পাসপোর্ট আমাদের মৌলিক অধিকার।

বর্তমান সরকারের আমলে ‘ই-পাসপোর্ট’ প্রবর্তনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে আধুনিক ও ডিজিটাল করা হয়েছে।

কিন্তু দীর্ঘদিনের একটি অভিশাপ আমাদের এই সেবা প্রাপ্তিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করে আসছে—আর তা হলো ‘দালাল চক্র’।

পাসপোর্ট অফিসের সামনে গেলেই ফরম পূরণ, দ্রুত ডেলিভারি কিংবা ভুল সংশোধনের নাম করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার এক চিরচেনা দৃশ্য আমরা দেখে আসছি।

তবে এবার সেই চিত্র বদলাতে যাচ্ছে।

গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ পাসপোর্ট অফিসকে পুরোপুরি দালালমুক্ত করার জন্য কঠোর ও নতুন কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন।

সরকারের এই নতুন উদ্যোগ কি সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি শেষ করতে পারবে?

কেন পাসপোর্ট অফিস থেকে দালাল নির্মূল করা এত জরুরি?

আজকের ব্লগে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন ঘোষণা এবং এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

পাসপোর্ট অফিস দালালমুক্ত হওয়া কেন জরুরি, তা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়।

পাসপোর্ট দালাল মুক্ত

বরং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়। দেখে নিন এর প্রয়োজনীয়তা-

১. আর্থিক শোষণ বন্ধ করা

দালালরা সাধারণত সরকারি ফি-র চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা হাতিয়ে নেয়।

অনেক সময় গরিব ও সাধারণ মানুষ ধার-দেনা করে পাসপোর্টের টাকা জোগাড় করেন, যা দালালের পকেটে যায়।

অফিস দালালমুক্ত হলে মানুষ সরাসরি নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে পাসপোর্ট করতে পারবে।

২. সঠিক তথ্যের নিশ্চয়তা ও ভুল সংশোধন

দালালরা দ্রুত কাজ করার নাম করে অনেক সময় আবেদনে ভুল তথ্য দেয়, যা পরবর্তীতে পুলিশ ভেরিফিকেশন বা বিদেশ যাত্রার সময় বড় বিপদের কারণ হয়।

সরাসরি আবেদন করলে তথ্য নির্ভুল থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে এবং ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হয় না।

৩. সাধারণ মানুষের হয়রানি ও মানসিক প্রশান্তি

পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দালালের কাছে ধর্ণা দেওয়া বা তাদের পেছনে ঘোরা অত্যন্ত অপমানজনক ও মানসিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক।

দালালমুক্ত পরিবেশ থাকলে একজন নাগরিক সম্মানের সাথে নিজের কাজ নিজে শেষ করতে পারবেন, যা সরকারি সেবার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াবে। তাই পাসপোর্ট দালাল মুক্ত হতে হবে।

৪. জাতীয় নিরাপত্তা ও জালিয়াতি রোধ

দালালরা অনেক সময় ভুয়া জন্মনিবন্ধন বা পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

এটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। দালাল নির্মূল হলে জালিয়াতির সুযোগ কমে যাবে এবং শুধুমাত্র প্রকৃত নাগরিকরাই পাসপোর্ট পাবেন।

৫. ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রকৃত প্রতিফলন

সরকার যেহেতু ই-পাসপোর্ট এবং অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম চালু করেছে, সেখানে দালালের উপস্থিতি থাকা মানেই সিস্টেমের ব্যর্থতা।

দালালমুক্ত অফিস মানেই হলো ডিজিটাল সেবার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষ ঘরে বসেই সেবা পাবে।

৬. দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা

পাসপোর্ট অফিসে দালালের অস্তিত্ব থাকা মানেই ভেতরে কোনো না কোনো অসাধু কর্মকর্তার সাথে তাদের যোগসাজশ আছে।

দালাল নির্মূল হলে অফিসের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ চক্রটিও ভেঙে পড়বে, যা পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনবে।

পাসপোর্ট দালাল মুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি বলেছেন?

২৩শে ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ পাসপোর্ট অফিসকে দালালমুক্ত করতে বেশ কিছু কঠোর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হল-

১. জিরো টলারেন্স নীতি:

তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, পাসপোর্ট অফিসে দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।

কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সাথে দালালের যোগসাজশ প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার পাশাপাশি কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

২. বিশেষ টাস্কফোর্স ও গোয়েন্দা নজরদারি:

প্রতিটি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনে এবং ভেতরে সাদা পোশাকে পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যারা সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়, তাদের চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

৩. ডিজিটাল সেবার প্রসার:

তিনি জানান, ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করা হবে যাতে মানুষ দালালের ওপর নির্ভর না করে নিজেরাই সব কাজ করতে পারেন।

অনলাইনে আবেদন এবং পেমেন্ট সিস্টেমকে আরও স্বচ্ছ করার ওপর তিনি জোর দেন।

৪. ওয়ান-স্টপ সার্ভিস:

পাসপোর্ট অফিসগুলোতে সেবার মান বাড়াতে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ বা এক জায়গায় সব সমাধান দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

এতে একজন আবেদনকারীকে বিভিন্ন টেবিলে ঘুরতে হবে না, ফলে হয়রানি কমবে।

৫. অভিযোগ কেন্দ্র:

সচিবালয়ে তিনি আরও জানান যে, পাসপোর্ট অফিসে যেকোনো অনিয়ম বা দালালের উৎপাত দেখলে সাধারণ মানুষ যাতে সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন, সেই ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হচ্ছে।

বর্তমানে কি পাসপোর্ট দালাল মুক্ত আছে?

না, বাস্তবতা হলো পাসপোর্ট অফিস এখনো পুরোপুরি দালালমুক্ত হয়নি।

তবে সরকার এটি নিয়ন্ত্রণে একদম নতুন এবং ভিন্নধর্মী কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনভাবে দেখা যেতে পারে:

১. দালালের নতুন রূপ: “নিবন্ধিত এজেন্ট”

সবচেয়ে বড় খবর হলো, সরকার দালালদের পুরোপুরি উচ্ছেদ করতে না পেরে তাদের একটি কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, পাসপোর্ট অফিসে যারা সাধারণ মানুষকে ফরম পূরণে সাহায্য করে (যাদের আমরা দালাল বলি), তাদের ‘নিবন্ধিত এজেন্ট’ হিসেবে বৈধতা দেওয়া হতে পারে।

উদ্দেশ্য: তারা নির্দিষ্ট ফি-র বিনিময়ে সেবা দেবে এবং কোনো অনিয়ম করলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

অর্থাৎ, লুকোচুরি বন্ধ করে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।

২. ডিজিটাল বাধার সুবিধা নিচ্ছে দালালরা

বর্তমানে ই-পাসপোর্ট পদ্ধতি অনেক আধুনিক হলেও গ্রামের বা সাধারণ অনেক মানুষ নিজে নিজে অনলাইনে ফরম পূরণ বা পেমেন্ট করতে পারেন না।

এই সুযোগটাই দালালরা নেয়। তারা কম্পিউটারের দোকানের আড়ালে বা অফিসের সামনে ঘোরাঘুরি করে মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে।

৩. কঠোর অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি

মাঝেমধ্যেই র‍্যাব বা পুলিশ পাসপোর্ট অফিসগুলোতে ঝটিকা অভিযান চালায় এবং দালালদের আটক করে জেল-জরিমানা দেয়।

তবে বাস্তবতা হলো, অভিযানের কয়েকদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে যায়।

এই চক্রটি ভাঙার জন্য এখন স্থায়ী প্রশাসনিক সংস্কারের চেষ্টা চলছে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা – পাসপোর্ট দালাল মুক্ত

১. পাসপোর্ট অফিসে দালালের খপ্পর থেকে বাঁচার উপায় কী?

সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিজের আবেদন নিজেই অনলাইনে (www.epassport.gov.bd) পূরণ করা।

ব্যাংকের নির্ধারিত ফি সরাসরি এ-চালান বা অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দিন। কোনো তৃতীয় পক্ষকে টাকা বা কাগজপত্র দেবেন না।

২. দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট করলে কি দ্রুত পাওয়া যায়?

এটি একটি ভুল ধারণা। পাসপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়া (পুলিশ ভেরিফিকেশন ও প্রিন্টিং) সম্পূর্ণ সরকারি সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল।

৩. পাসপোর্ট অফিসে কোনো অনিয়ম দেখলে কোথায় অভিযোগ করব?

প্রতিটি পাসপোর্ট অফিসে একজন ‘উপ-পরিচালক’ বা ‘সহকারী পরিচালক’ থাকেন। আপনি সরাসরি তাঁর রুমে গিয়ে অভিযোগ করতে পারেন। এছাড়া অনেক অফিসে অভিযোগ বক্স এবং নির্দিষ্ট হটলাইন নম্বর দেওয়া থাকে।

৪. দালালদের কি ‘নিবন্ধিত এজেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, যারা মানুষকে ফরম পূরণে কারিগরি সহায়তা দেয়, তাদের একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে ‘নিবন্ধিত এজেন্ট’ হিসেবে লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে।

৫. অনলাইনে আবেদন করলে কি পাসপোর্ট অফিসে যেতেই হবে?

হ্যাঁ, অনলাইনে আবেদন ও ফি জমা দেওয়ার পর আপনাকে নির্দিষ্ট তারিখে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) এবং চোখের মণির স্ক্যান (আইরিস) দিয়ে আসতে হবে।

উপসংহার – পাসপোর্ট দালাল মুক্ত

পরিশেষে বলা যায়, পাসপোর্ট অফিসকে দালালমুক্ত করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের এই ঘোষণা ও নতুন পদক্ষেপগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।

সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে এর কোনো বিকল্প নেই।

তবে শুধু প্রশাসনিক কড়াকড়ি বা আইন দিয়ে এই দীর্ঘদিনের জঞ্জাল পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা।

একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে, নিজের কাজ নিজে করার মধ্যে যেমন মর্যাদা আছে, তেমনি এতে জালিয়াতির ঝুঁকিও কম থাকে।

প্রযুক্তির এই যুগে ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়া এখন অনেক সহজ ও হাতের নাগালে।

তাই দালালের পেছনে না ছুটে সরাসরি সরকারি নিয়ম অনুসরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

সরকারের এই ডিজিটাল উদ্যোগ সফল হলে এবং পাসপোর্ট অফিসগুলো সত্যিকারের সেবা কেন্দ্রে পরিণত হলে, তা হবে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের পথে এক বিশাল মাইলফলক।

আমরা আশা করি, খুব দ্রুতই প্রতিটি পাসপোর্ট অফিস হবে হয়রানিমুক্ত এবং সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন