টিআইএন থাকলেই দিতে হবে কর—এমন একটি নতুন ও কঠোর নিয়ম চালুর বিষয়ে অতি সম্প্রতি এনবিআর কর্মকর্তাদের সাথে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়ানো এবং কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা।
তবে কর বিশেষজ্ঞদের মতে, শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ বাতিল করা হলে আয় না থাকা সত্ত্বেও দেশের একটি বিপুলসংখ্যক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত করদাতাকে ন্যূনতম করের আওতায় আসতে হতে পারে।
বর্তমানে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করার ফলে ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ লাখ ব্যক্তি নিবন্ধনের আওতায় এসেছেন, যা এনবিআরের জন্য একটি বড় সাফল্য।
রাজস্ব বৃদ্ধির এই সরকারি তাগিদ এবং সাধারণ নাগরিকদের পকেটের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েই মূলত আজকের এই বিস্তারিত আলোচনা।
সাম্প্রতিক বৈঠকে এনবিআর কর্মকর্তারা দেশের রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়াতে নতুন কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবটি হলো শূন্য রিটার্ন বাতিলের সিদ্ধান্ত।
বর্তমানে অনেকেরই বাধ্যতামূলক নানা প্রয়োজনে (যেমন: ক্রেডিট কার্ড নেওয়া, জমি কেনাবেচা, বা ব্যবসা শুরু করা) টিআইএন খুলতে হয়।
কিন্তু বছর শেষে আয় করযোগ্য সীমার নিচে থাকলে তারা ‘শূন্য রিটার্ন’ জমা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন।
নতুন এই নিয়মের উদ্দেশ্য হলো— টিআইএনধারী প্রত্যেককে একটি নির্দিষ্ট বা ন্যূনতম করের আওতায় নিয়ে আসা।
কেন এই কঠোর অবস্থান? এনবিআর-এর যুক্তি
এনবিআর সূত্র অনুযায়ী, কর ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিটাল করার সুফল হাতেনাতে মিলতে শুরু করেছে।
অনলাইন রিটার্নে জোয়ার:
চলতি অর্থবছর থেকে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করায় করদাতার সংখ্যায় এক বিশাল লাফ দেখা গেছে।
৫০ লাখের মাইলফলক:
ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ লাখ ব্যক্তি অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য নিজেদের নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।
এনবিআরের ধারণা, এই বিপুলসংখ্যক নিবন্ধিত নাগরিককে যদি ন্যূনতম করের আওতায় আনা যায়, তবে রাষ্ট্রের রাজস্ব ভাণ্ডার এক ধাক্কায় অনেক শক্তিশালী হবে।
টিআইএন থাকলেই দিতে হবে কর সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের মত
কর বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
সরকার রাজস্ব বাড়ানোর তাগিদ দিলেও কর বিশেষজ্ঞরা কিন্তু পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না।
তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
“শূন্য রিটার্ন বাতিল করে যদি সবার জন্য ন্যূনতম কর বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে একটি বিশালসংখ্যক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত করদাতা, যাদের প্রকৃত অর্থে কোনো করযোগ্য আয় নেই, তারা অন্যায্য আর্থিক চাপের মুখে পড়বেন।” – কর বিশেষজ্ঞ
বিশেষজ্ঞদের মূল যুক্তিগুলো হলো:
১. বাধ্যতামূলক টিআইএন-এর ফাঁদ: অনেকে শুধু সঞ্চয়পত্র কিনতে বা মোটরসাইকেল নিবন্ধন করতে টিআইএন বাধ্যতাবশত খুলেছেন।
তাদের নিয়মিত আয় না থাকলেও এখন পকেট থেকে কর গুনতে হবে।
২. ট্যাক্স জাস্টিস বা কর ন্যায়বিচার: প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার মূল কথাই হলো— যার আয় বেশি, সে বেশি কর দেবে; যার আয় নেই, সে দেবে না।
সবার ওপর ঢালাও কর বসালে তা এই নীতির পরিপন্থী হতে পারে।
টিআইএন থাকলেই দিতে হবে কর – সুবিধা ও অসুবিধা
আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘শূন্য রিটার্ন’ বাতিল করে টিআইএন থাকলেই ন্যূনতম কর বাধ্যতাবোধ করার বিষয়টি দেশের রাজস্ব বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তবে একই সাথে এটি সাধারণ ও নিম্নআয়ের নাগরিকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।
সুবিধা সমূহ:
- রাজস্ব বৃদ্ধি: সরকারের অভ্যন্তরীণ তহবিল বা রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
- করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি: বিপুলসংখ্যক নাগরিক কর জালের আওতায় আসবে, যা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করবে।
- কর ফাঁকি রোধ: ঢালাওভাবে আয় লুকিয়ে শূন্য রিটার্ন দেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হবে।
- উন্নয়নমূলক কাজে গতি: সংগৃহীত বাড়তি কর দেশের অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করা যাবে।
অসুবিধা সমূহ:
- অন্যায্য আর্থিক চাপ: করযোগ্য আয় না থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের পকেট থেকে টাকা গুনতে হবে।
- টিআইএন খোলার ভীতি: অতিরিক্ত করের ভয়ে সাধারণ মানুষ জরুরি প্রয়োজনেও টিআইএন খুলতে অনিহা প্রকাশ করবে।
- বৈষম্য তৈরি: প্রকৃত আয় বিবেচনা না করে সবার ওপর সমহারে কর চাপানো কর ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
- প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোগান্তি: শিক্ষার্থী, বেকার বা গৃহিণীরা যারা বিশেষ প্রয়োজনে টিআইএন খুলেছেন, তারা তীব্র সংকটে পড়বেন।
FAQ – টিআইএন থাকলেই দিতে হবে কর
১. শূন্য রিটার্ন (Zero Return) কী?
বছরের শেষে যদি কোনো করদাতার মোট আয় করযোগ্য সীমার নিচে থাকে, তবে তাকে কোনো কর দিতে হয় না।
শুধু আয়ের হিসাব বিবরণী জমা দিতে হয়, একেই শূন্য রিটার্ন বলে।
২. নতুন নিয়ম অনুযায়ী টিআইএন (TIN) থাকলে কি সবাইকে কর দিতে হবে?
হ্যাঁ, প্রস্তাবিত নিয়মটি পাস হলে আপনার আয় থাকুক বা না থাকুক।
শুধু টিআইএন থাকার কারণেই আপনাকে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম কর দিতে হতে পারে।
৩. বর্তমানে অনলাইনে কত মানুষ রিটার্ন জমার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন?
এনবিআর-এর সূত্র অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর থেকে অনলাইনে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করায় ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ লাখ ব্যক্তি নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।
৪. বিশেষ প্রয়োজনে (যেমন: জমি কেনা বা ক্রেডিট কার্ড) টিআইএন খুললে কি কর দিতে হবে?
হ্যাঁ, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে যেকোনো বিশেষ বা সাময়িক প্রয়োজনে টিআইএন খুললেও আপনাকে ন্যূনতম করের আওতায় আসতে হবে।
৫. কর বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে কী বলছেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ঢালাওভাবে কার্যকর করলে শিক্ষার্থী, বেকার বা নিম্নআয়ের মানুষ, যাদের কোনো করযোগ্য আয় নেই, তারা অন্যায্য আর্থিক চাপের মুখে পড়বেন।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, অনলাইন কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষের নিবন্ধন নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
তবে রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়ানোর এই সরকারি প্রচেষ্টায় যেন কোনোভাবেই সাধারণ, নিম্নআয় কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অন্যায্য আর্থিক চাপের মুখে না পড়ে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কর আদায়ের ক্ষেত্রে কেবল কড়াকড়ি না বাড়িয়ে, জনগণের প্রকৃত আয় বিবেচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সংগত নীতিমালা প্রণয়ন করাই হবে দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আসল চাবিকাঠি।


