দেশে ৪৯ জেলায় হচ্ছে নতুন জেলা স্কুল হতে যাচ্ছে।

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ডকে মজবুত করতে প্রয়োজন মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘জিলা স্কুল’ একটি ঐতিহ্যের নাম, যা যুগ যুগ ধরে মেধাবী শিক্ষার্থী গড়ে তুলতে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে।

তবে দীর্ঘকাল ধরে দেশের অনেক জেলা এই বিশেষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল।

সেই অভাব পূরণে এবং তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বর্তমানে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের যে ৪৯টি জেলায় কোনো জিলা স্কুল নেই, সেখানে নতুন করে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত জেলা স্কুল স্থাপন করা হবে।

এই উদ্যোগ কেবল শিক্ষা বিস্তারে নয়, বরং গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হিসেবে প্রস্তুত করতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

নতুন এই জেলা স্কুলগুলো স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন বর্তমান সরকারের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

নতুন জেলা স্কুল

৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে সচিবালয়ে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসা মূল তথ্যগুলো হলো:

  • টার্গেট: যেসব জেলায় বর্তমানে কোনো ‘জিলা স্কুল’ নেই, সেই ৪৯টি জেলায় নতুন স্কুল স্থাপন করা হবে।
  • কাঠামো: এই স্কুলগুলো প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত (উচ্চমাধ্যমিক) পরিচালিত হবে।
  • উদ্দেশ্য: জেলা পর্যায়ে মানসম্মত ও সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

এই সভায় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিটি জেলায় কেন জেলায় কেন নতুন জেলা স্কুল হওয়া প্রয়োজন

একটি জেলায় কেন জেলা স্কুল থাকা প্রয়োজন, তা কেবল শিক্ষার বিষয় নয়।

এটি একটি এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথেও জড়িত। জেলা স্কুল মূলত একটি জেলার শিক্ষার ‘ব্র্যান্ড’ বা আদর্শ হিসেবে কাজ করে।

নিচে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে জেলা স্কুল থাকার গুরুত্ব তুলে ধরা হলো:

১. গুণগত শিক্ষার নিশ্চয়তা

জেলা স্কুলগুলো সাধারণত অভিজ্ঞ শিক্ষক, উন্নত পাঠ্যক্রম এবং কঠোর তদারকির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

প্রতিটি জেলায় এমন একটি স্কুল থাকলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়।

২. মফস্বল ও গ্রামীণ মেধার বিকাশ

অনেক সময় গ্রামের অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর্থিক অভাব বা যাতায়াত সমস্যার কারণে ঢাকা বা বড় শহরে গিয়ে পড়তে পারে না।

নিজ জেলায় একটি মানসম্মত সরকারি স্কুল থাকলে সেই মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ঘরের কাছেই নিজেদের বিকশিত করার প্ল্যাটফর্ম পায়।

৩. শিক্ষার খরচ কমানো

বেসরকারি নামী স্কুলগুলোর বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ অনেক বেশি থাকে।

জেলা স্কুলগুলো সরকারি অনুদানে পরিচালিত হওয়ায় নামমাত্র খরচে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত—সব শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পায়।

এতে অভিভাবকদের ওপর থেকে আর্থিক চাপ কমে।

৪. অন্যান্য স্কুলের জন্য ‘মডেল’ হওয়া

একটি জেলায় যখন একটি উন্নত জেলা স্কুল থাকে, তখন আশেপাশের অন্যান্য বেসরকারি বা এমপিওভুক্ত স্কুলগুলো তাদের অনুসরণ করার চেষ্টা করে।

এটি পুরো জেলার শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করে।

৫. সহ-শিক্ষা কার্যক্রম ও নেতৃত্ব গঠন

জেলা স্কুলগুলোতে শুধু পড়াশোনা নয়, বরং বিতর্ক, খেলাধুলা, স্কাউটিং এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বেশি জোর দেওয়া হয়।

এটি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং জেলা পর্যায়ে দক্ষ নেতৃত্ব তৈরিতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশে মোট কতটি জেলা স্কুল রয়েছে এবং কোন কোন জেলায় রয়েছে

বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ১৫টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সরাসরি ‘জিলা স্কুল’ (Zilla School) নামে পরিচিত।

ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ১৩টি এবং পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত ২টি। এই মোট ১৫টি স্কুলই মূলত ঐতিহ্যবাহী জিলা স্কুল হিসেবে স্বীকৃত।

নিচে জেলা ও স্কুলের নামের তালিকা দেওয়া হলো:

১। বরিশাল জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮২৯ সাল

২। কুমিল্লা জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮৩৭ সাল

৩। রংপুর জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮৩৭ সাল

৪। যশোর জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮৩৮ সাল

৫। ফরিদপুর জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮৪০ সাল

৬। দিনাজপুর জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮৪৮ সাল

৭। নোয়াখালি জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮৫০ সাল

৮। পাবনা জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮৫৩ সাল

৯। বগুড়া জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮৫৩ সাল

১০। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৯৫৩ সাল

১১। জামালপুর জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮৮১ সাল

১২। খুলনা জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৮৮৫ সাল

১৩। নওগাঁ জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৯১৭ সাল।

১৪। কুষ্টিয়া জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৯৬১ সাল

১৫। বরগুনা জিলা স্কুল – প্রতিষ্ঠিত ১৯৭০ সাল

বর্তমানে দেশে ৬৯১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তবে ‘জিলা স্কুল’ নামটির সাথে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য জড়িত থাকায় কেবল এই ১৫টি স্কুলই এই নামে পরিচিত।

সরকার যে নতুন ৪৯টি জেলা স্কুল করার ঘোষণা দিয়েছে, তার উদ্দেশ্য হলো বাকি জেলাগুলোতেও একই মানে আধুনিক স্কুল গড়ে তোলা।

কবে থেকে এই নতুন জেলা স্কুল তৈরি হওয়া শুরু হবে

৪৯টি নতুন জেলা স্কুল স্থাপনের প্রকল্পের বিষয়ে সরকার বর্তমানে পরিকল্পনা ও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন গত ৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন।

কবে থেকে কাজ শুরু হবে, সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:

প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য সময়সীমা

ঘোষণা ও অনুমোদন: ২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।

এটি বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পের তালিকায় আছে।

জমি অধিগ্রহণ ও জরিপ: প্রকল্পের প্রথম ধাপ হিসেবে যেসব জেলায় জিলা স্কুল নেই, সেখানে উপযুক্ত জমি চিহ্নিতকরণ এবং জরিপের কাজ শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।

সাধারণত এ ধরনের বড় প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে কয়েক মাস সময় লাগে।

নির্মাণ কাজের সম্ভাব্য শুরু: সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প (ADP) অনুযায়ী, জমি সংক্রান্ত জটিলতা শেষ হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে ভৌত অবকাঠামো বা ভবন নির্মাণের কাজ দৃশ্যমান হতে পারে।

পাঠদান শুরুর লক্ষ্য: যেহেতু এই স্কুলগুলো প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত হবে, তাই ভবন নির্মাণের সাথে সাথে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও সমান্তরালভাবে চলবে।

আশা করা হচ্ছে, আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে স্কুলগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে।

স্কুলগুলোর ধরণ কেমন হবে?

শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্যমতে, এই স্কুলগুলো হবে উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের আদলে (School and College)।

অর্থাৎ একই ক্যাম্পাসে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক এই তিন স্তরের সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা থাকবে।

FAQ: নতুন জেলা স্কুল

১. নতুন জেলা স্কুলগুলো কোন জেলাগুলোতে স্থাপন করা হবে?

বাংলাদেশের যে ৪৯টি জেলায় বর্তমানে কোনো ‘জিলা স্কুল’ (Zilla School) নেই, সেই জেলাগুলোতে এই নতুন স্কুলগুলো স্থাপন করা হবে।

এর ফলে দেশের ৬৪টি জেলাই সরকারি জেলা স্কুলের আওতায় আসবে।

২.  এই স্কুলগুলো কি শুধু মাধ্যমিক (High School) পর্যন্ত হবে?

না। শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, এই স্কুলগুলো হবে সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থার আদলে।

অর্থাৎ এখানে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি (উচ্চমাধ্যমিক) পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ থাকবে।

৩. স্কুলগুলোতে ভর্তি প্রক্রিয়া কেমন হবে?

সাধারণত সরকারি স্কুলগুলোতে যেভাবে কেন্দ্রীয়ভাবে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ভর্তি নেওয়া হয়। এই স্কুলগুলোতেও মেধা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একই নিয়ম অনুসরণ করা হতে পারে।

৪. এই স্কুলগুলো স্থাপনের মূল লক্ষ্য কী?

এর মূল লক্ষ্য হলো জেলা পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষার বৈষম্য দূর করা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের গ্রাম থেকে শহরে চলে আসা রোধ করা এবং কম খরচে আধুনিক ও ডিজিটাল শিক্ষা নিশ্চিত করা।

৫. স্কুলগুলোর নির্মাণ কাজ কবে নাগাদ শেষ হতে পারে?

২০২৬ সালে এই প্রকল্পের ঘোষণা আসায় বর্তমানে এটি পরিকল্পনা ও জমি অধিগ্রহণ পর্যায়ে আছে।

বড় ধরনের অবকাঠামো হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে স্কুলগুলো পাঠদানের জন্য প্রস্তুত হবে।

উপসংহার – নতুন জেলা স্কুল

পরিশেষে বলা যায়, ৪৯টি জেলায় নতুন জেলা স্কুল স্থাপনের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের ইতিহাসে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

দীর্ঘদিনের ভৌগোলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দূর করে তৃণমূলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি হবে এক আশীর্বাদ।

আধুনিক অবকাঠামো এবং মানসম্মত সরকারি শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই স্কুলগুলো কেবল দক্ষ মানবসম্পদই তৈরি করবে না।

বরং ২০৪১ সালের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করবে।

এখন সময়োপযোগী বাস্তবায়ন এবং সঠিক তদারকি নিশ্চিত করতে পারলে, এই নবনির্মিত জেলা স্কুলগুলোই হয়ে উঠবে আগামীর বাংলাদেশের মেধা বিকাশের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন