প্রাকৃতিকভাবে চুল ঘন করার উপায় এই বাক্য লিখে গুগলে সার্চ করলে অনেক রেজাল্ট পাওয়া যায়। আর এই রেজাল্ট থেকে পাওয়া তথ্যগুলি প্রয়োগ করে অনেকেই উপকৃত হোন আবার অনেকে হয়না। কারণ শুধু মাথার উপরিভাগ ও চুলের যত্ন নিলেই হয়না। আমাদের শরীরেও পর্যাপ্ত পুষ্টির প্রয়োজন চুল ঘন করতে। কারণ প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হলে চুল ঘন করা সম্ভব নয়। আবার অনেকের উদ্ভট লাইফস্টাইলের কারণেও চুল পড়ে যায়। আর চুল গজাতে চায় না।

কিভাবে আমাদের চুল দিন দিন পাতলা হয়ে যায়ঃ

আমাদের প্রতিদিন ১০০ টির মত চুল পড়ে যায়। এটা একেবারেই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ১০০টি চুল পড়ার পাশাপাশি আবার চুল নতুন করে গজিয়েও থাকে। যার ফলে ব্যালান্স হয়। কিন্তু অনেকের ১০০ টি থেকেও অনেক চুল পড়ে যায়, আবার নতুন করে চুল আবার গজায়ও না। যার ফলে চুল ধীরে ধীরে পাতলা হতে থাকে। আবার অনেকের নান রকম চুলের পুষ্টিগত সমস্যার জন্য চুলের দানা বাদামী বর্ণ বা ধূসর বর্ণের হয়ে পাতলা হয়ে যায়। এতে তখন ধীরে ধীরে এক সময় চুলটি মাথা থেকে ঝড়ে পড়ে যায়। আবার অনেকের চুলের মাথার দিকে ফেটে যেয়ে চুল অনেকে দুর্বল হয়ে যায়। এভাবেও চুল পড়ে যায়। তবে চুল ঘন করার উপায় অনেক আছে। যা প্রাকৃতিকভাবেই করা যায়।

কি কি কারণে আমাদের চুল ঝড়ে পড়ে যায়ঃ

নানা কারণে আমাদের এই মূল্যবান চুল ঝড়ে পড়ে যেতে পারে। এই চুল ঝড়ে পড়ার কারণগুলি হলঃ

১। চুল ঝড়ে পড়ার সবথেকে প্রধান কারণ অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন। আমরা যখন বয়সে ছোট থাকি, তখন একটি নিয়মের মধ্য দিয়েই বেশিরভাগ যাই। কিন্তু দিন দিন যত বড় হতে থাকি, ততই আমরা ছন্নছাড়া হয়ে পড়ি। তখন আমরা যখন তখন ঘুমাই, যখন তখন উঠি,
রাত জাগি। অনেকেই ঠিকমত প্রতিদিন গোসল করেনা বা করলেও চুল ঠিকমত পরিষ্কার করেনা। এছাড়া ঠিকমত বিছানা বালিশ পরিষ্কার না করার ফলেও এই চুল দিন দিন পড়তে থাকে।

২। অতিরিক্ত ধুমপান চুল পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। যার ফলে দেখা যায়, যারা অতিরিক্ত ধুমপান করে তাদের চুল খুবই পড়ে।

কিছু হেয়ার স্টাইলিং প্রডাক্ট
কিছু হেয়ার স্টাইলিং প্রডাক্ট, যা ব্যবহার করা যাবেনা

৩। চুলে অতিরিক্ত স্টাইলিং প্রডাক্ট ব্যবহার করা, খারাপ ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল যুক্ত শ্যাম্পু, তেল ব্যবহার করা। এই সকল কারণেও আমাদের মূল্যবান চুল পড়ে যায়। এছাড়া হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহারেও চুল পড়ে যায়।

৪। গবেষনায় দেখা গেছে অতিরিক্ত চিনি, ভাজাপোড়া, কমল পানীয় খেলেও চুল পড়ে যাতে পারে।

৫। দিন দিন বয়স বেড়ে যাবার কারণেও চুল পড়ে যেতে পারে। তাই বয়স বাড়ার সাথে সাথে চুলেরও সঠিক যত্ন নেওয়া শুরু করতে হবে।

৬। বংশগত কারণে ও জেনেটিক কারণে চুল পড়ে। আর এইভাবে চুল পড়লে ধীরে ধীরে টাক হয়ে যাবার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি থাকে।

তবে চুল অতিরিক্ত পড়া শুরু করলেও চুল ঘন করার উপায় অনেক আছে। নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে ও চুলের সঠিক প্রাকৃতিক যত্নের মাধ্যমে চুল পড়া কমিয়ে চুল ঘন করা যায়।

দেখে নিন চুল ঘন করার কি কি উপায় আছেঃ

চুল পড়া কমাতে ও চুল ঘন করতে তেলের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু তেলের সঠিক প্রয়োগ করা জরুরী।

ক্যাস্টর ওয়েল, ওলিভ ওয়েল, নারিকেল তেল, ভিটামিন ই ক্যাপসুল, লেবুঃ

সম পরিমাণ ক্যাস্টর ওয়েল, ওলিভ ওয়েল, নারিকেল তেল একটি পাত্রে নিয়ে এর মধ্যে ১টি ভিটামিন ই ক্যাপসুল ফুটো করে এর মধ্যকার তেল বের করে এই মিশ্রণের সাথে নিতে হবে। এরপর এর সাথে ১ চামচ লেবুর রস মিশিয়ে এই তেলটি মাথার চুলে ও স্ক্যাল্পে ভালভাবে লাগাতে হবে। লাগানোর সময় মাথায় ম্যাসাজ করে লাগালে খুব ভাল হয়। এতে করে মাথার রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া খুব ভাল হবে।

ক্যাস্টর ওয়েল, ওলিভ ওয়েল, নারিকেল তেল
ক্যাস্টর ওয়েল, ওলিভ ওয়েল, নারিকেল তেল

যেটা মাথায় নতুন চুল গজাতে সাহায্য করবে। আর ক্যাস্টর ওয়েল, ওলিভ ওয়েল, নারিকেল তেল এই তিন তেলে রয়েছে মাথার চুলের জন্য সর্বোচ্চ পুষ্টি। আর ভিটামিন ই ক্যাপসুল চুলকে মজবুত করবে। আর লেবু মাথার খুশকী দূর করতে খুবই সাহায্য করবে। আর এই তেল সপ্তাহে ৩ দিন ব্যবহার করলে মাথার চুল পড়া অনেক কমে যাবে ও নতুন করে
চুল গজাতে খুবই সাহায্য করবে। এই তেল গোসল করার ১ ঘন্টা আগে মাথায় লাগিয়ে রাখতে হবে। গোসলের সময় চুল খুব ভালভাবে শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার যেন ক্ষতিকর কেমিক্যাল যুক্ত না হয়। এই রকম শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার ব্যবহার করা যাবেনা। আজকাল অনেক নামকরা ব্রান্ডের নকল শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার বাজারে পাওয়া যায়। এই ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকতে হবে।

চুল ঘন করতে ডিমের ব্যবহারঃ

ডিমের সাদা অংশ চুলকে ঘন করতে সাহায্য করে। আর ডিমের কুসুম চুলকে চকচকে ও মিসৃণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া ডিমের প্রোটিন চুল পড়া কমায় ও নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে থাকে।

চুল ঘন করার উপায়

এছাড়া ডিমে রয়েছে ভিটামিন বি যা চুলকে শক্তিশালী ও মজবুত করে ও চুলের বৃদ্ধিতেও অনেক কাজে দেয়। এ জন্য একটি কাঁচা ডিম ভেঙ্গে নিয়ে এটি ভালভাবে গুলে নিয়ে মাথার স্ক্যাল্পে ও চুলে লাগিয়ে রেখে ৩০ মিনিট পর ভাল শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এভাবে সপ্তাহে ২ দিন করা খুবই ভাল হবে।

চুল ঘন করতে পেঁয়াজের ব্যবহারঃ

চুল পড়া কমাতে ও নতুন চুল গজাতে পেঁয়াজের কোন বিকল্প নেই। পেঁয়াজের রস চুল গজাতে যুহান্তকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ পেঁয়াজের মধ্যে আছে সালফার ও অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান যা চুল গজাতে খুবই সাহায্য করে। পেঁয়াজের এই অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদানের জন্য মাথার স্ক্যাল্পের ক্ষতিকর ইনফেকশন ও ব্যাকটেরিয়া দূর হয়। যা পরবর্তীতে চুল গজাতে খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে।

চুল ঘন করার উপায়
পেয়াজ ও রোজমেরী তেল

পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে ছোট ছোট করে কেটে ব্লান্ডারে নিয়ে এর মধ্য থেকে রস বের করে নিয়ে মাথার স্ক্যাল্পে লাগাতে হবে। পেঁয়াজের রসের একটা তীব্র গন্ধ আছে। যা অনেকেই সহ্য করতে পারেনা। তাই এই গন্ধ দূর করতে করতে এর সাথে রোসমেরী তেল যোগ করে নিতে হবে। এরপর এই রস গোসলের ৩০ মিনিট আগে লাগিয়ে ভালকরে শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এভাবে প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে ২ বার করতে থাকতে হবে। এক সময় দেখা যাবে, আপনার চুল ঘন হতে শুরু করেছে।

হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট এর মাধ্যমে চুল ঘন করাঃ

উপরের কোন মাধ্যমেই যদি কাজ না করে, তবে আধুনিক চিকিৎসা হেয়ার হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট করা যেতে পারে। এই পদ্ধতিতে মাথার যে অংশে চুল কম বা চুল নেই সেই জায়গায় মেশিনের মাধ্যমে চুল প্রতিস্থাপন করতে হয়। আর এই চুল গুলো মাথায় যে জায়গায় চুল বেশি সেখান থেকে অথবা শরীরের যেকোন জায়গা থেকে চুল সংগ্রহ করে ফাকা জায়গায় প্রতিস্থাপন করতে হয়। পৃথিবীর সব দেশেই এখন এও পদ্ধতি চালু হয়েছে। তবে এভাবে চুল প্রতিস্থাপন অনেক ব্যয়বহুল। আর এই পদ্ধতিতে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট করার জন্য অবশ্যই অভিজ্ঞ ও দক্ষ ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।

চুল ঘন করতে যে যে বিষয় খেয়াল রাখতে হবেঃ

১। প্রতিদিন গোসল করতে হবে।

২। নিয়মিত চুল শ্যাম্পু দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন চুলে কোন প্রকার খুশকি না বেড়ে যায়।

৩। ধুমপান করা অভ্যাস থাকলে, তা এখনি ত্যাগ করতে হবে।

৪। অতিরিক্ত মানসিক চাপ কখনোই নেওয়া যাবেনা। সব সময় টেনশন ফ্রী থাকার চেষ্টা করতে হবে। কারণ গবেষোণায় দেখা গেছে অতিরিক্ত মানসিক চাপ চুল পড়ার অন্যতম কারণ।

৫। নিয়মিত চুলের জন্য উপকারী প্রোটিন ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।

৬। ভেজা চুল কখনোই আচরানো যাবে না।

৭। হেয়ার স্টাইলিং প্রোডাক্ট ব্যবহার করা যাবে না।

৮। হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করা যাবে না।

৯। দিনে কমপক্ষে ১২ গ্লাস পানি খেতে হবে।

১০। বাইরে ধুলাবালি মধ্য থেকে আসলে সঙ্গে সঙ্গে চুল পরিষ্কার করে নিতে হবে।

১১। নিয়মিত বালিশ ও বিছানার চাদর পরিষ্কার করতে হবে।

১২। ভেজা চুল কখনোই জোরে জোরে চাপ ডলে ডলে মোছা যাবে না।

১৩। চিনি জাতীয় ও ভাজা পোড়া খাবার খাওয়া কমিয়ে দিতে হবে।

চুল ঘন করতে ও চুল পড়া কমাতে কি কি খাবার খেতে হবেঃ

চুল পড়া কমাতে ও চুল ঘন করতে যেমন চুল ও স্ক্যাল্পের যত্ন নিতে হবে, ঠিক তেমনি শরীরের অভ্যন্তরীন অনেক পুষ্টিরও প্রয়োজন। আর পুষ্টি পূরণে সঠিক খাবার গ্রহণ করতে হবে। চুলের পুষ্টির জন্য প্রোটিন, ক্যারোটিন, বায়োটিন, আয়রন, ভিটামিন সি, ওমেগা থ্রী, সেলেনিয়াম, ভিটামিন বি ১২, ভিটামিন ডি, ফলিক এসিড, ভিটামিন এ, জিংক ও ভিটামিন ই যুক্ত খাবার খেতে হবে।

দেখে নেই কোন কোন খাবারে এই উপাদানগুলি আছেঃ

নিচ থেকে দেখে নিন কোন কোন খাবারে চুলের জন্য পুষ্টিকর উপাদান আছে। যা নিয়মিত খেলে চুল পড়া কমে যেয়ে নতুন চুল গজাবে ও চুল ঘন হবে।

চুল ঘন করার উপায়
চুলের যত্নে প্রয়োজনীয় খাবার

প্রোটিনঃ ডিমের সাদা অংশ, মাছ, চিকেন ব্রেস্ট, দুধ, পনীর।

বায়োটিনঃ ডিম, বাদাম, কলা, গাজর, দই, আখরোট।

আয়রনঃ গরু, মুরগী বা খাসীর কলিজা, পালং শাক, ডিম, তরমুজ, বেদানা, মটর, ব্রকলি।

ভিটামিন সিঃ লেবু, কমলা লেবু, ক্যাপসিকাম, পেয়ারা

ওমেগা থ্রীঃ সালমন মাছ, চিয়াসীড, ফ্লাক্সসীড।

সেলেনিয়ামঃ ডিম, চিকেন ব্রেস্ট, পালং শাক, কলিজা।

ভিটামিন বি ১২: দুধ, কলিজা, ডিম, চিকেন, সালমন মাছ।

ভিটামিন ডিঃ সুর্যের আলো, দুধ, মাশরুম, পনীর

ফলিক এসিডঃ মশুরের ডাল, পেঁপে, ব্রকলি, পালং শাক, সবুজ শাকসবজি।

ভিটামিন এঃ মিষ্টি আলু, গাজর, লাউ, পালং শাক।

জিংকঃ কাজু বাদাম, চিকেন, মসুরের ডাল, দই, কুমড়ার বীজ।

ভিটামিন ইঃ বাদাম, পালং, মিষ্টি আলু, ক্যাপসিকাম, আখরোট।

উপরোক্ত খাবারগুলি নিয়মিত খেলে চুলের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব পূরণ হবে ও নতুন চুল গজাবে। আর চুল পড়াও কমে যাবে। এখানে প্রাকৃতিকভাবে চুল ঘন করার উপায় জানা হল। আর এই উপায়গুলি বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগ করলে চুল পড়া কমে যাবে ও চুল অনেক ঘন হয়ে যাবে।