সম্প্রতি গাজা যুদ্ধে পরাজিত পক্ষ হচ্ছে দুটি।  একটি ইসরাইল অপরটি হচ্ছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।  দুই পক্ষই যুদ্ধ চলাকালে জেরুজালেম, রামাল্লা এবং পশ্চিমতীরজুড়ে হওয়া বিক্ষোভ কঠোর হাতে দমনের চেষ্টা করে গেছে।  অধিকৃত পশ্চিমতীরে বিক্ষোভকারীদের গণহারে গ্রেফতারের পর পরিস্থিতি ‘শান্ত’ হয়েছে।  

মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় গণমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং এডিটর-ইন-চিফ ডেভিড হিয়ার্স্ট এক নিবন্ধে এসব কথা লেখেন।

Advertisement

তিনি লেখেন, এপ্রিলের পর থেকে ইসরাইলে দুই হাজার ১০০ ফিলিস্তিনি এবং পশ্চিমতীরে ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেফতার করে ইহুদি দেশটির পুলিশ। আর রামাল্লা ভিত্তিক আইনজীবীদের সূত্রমতে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এসময়ের মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক সুরক্ষার জন্য ২০ ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার করেছে।  অধিকাংশকে গ্রেফতার করা হয়েছে ‘সাম্প্রদায়িক কলহ সৃষ্টির লক্ষ্যে উসকানি’ এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধ ‘কুৎসা রটানো’র কারণে।

আরব সংখ্যালঘুদের আইনি সহায়তা দেওয়া সংগঠন আদালতের মতে, ইসরাইলের নাসরৎ শহরের পুলিশ স্টেশনকে ‘টর্চার রুম’ হিসেবে অভিহিত করা যায়।  যাদের গ্রেফতার করা হয়  তাদের ওই পুলিশ স্টেশনের টর্চার রুমে করা হয় অবর্ণনীয় নির্যাতন।  তাদের মাটিতে বসিয়ে রেখে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় মাথা ফ্লোরের দিকে নিচু করে রাখতে বাধ্য করা হয়।  এরপর তাদের প্রচুর মারধর করা হয়, মারের চোটে কেউ মাথা তুলতে চাইলে বেড়ে যায় নির্যাতন। 

আদালত জানাচ্ছে, যাদের গ্রেফতার করা হয় তাদের নির্যাতনের পর ওই টর্চার রুমের ফ্লোর রক্তে রঞ্জিত হয়ে যেত।

ফিলিস্তিনি বন্দি এবং সাবেক বন্দি বিষয়ক কর্তৃপক্ষ জানায়,  সম্প্রতি দেশজুড়ে গ্রেফতারের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বর হামলা এবং তাদের ঘরবাড়ি এবং সম্পদের ক্ষতিসাধন করা হয়েছে।

কিন্তু ইসরাইল বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কেউই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সক্ষম হয়নি। এর কারণ হিসেবে তারা খুঁজে পেয়েছে পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাওয়ার পথ নেই, কারণ কিছু বিষয় মৌলিকভাবে বদলে গেছে।

দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কাল্পনিক পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে 

সমস্যার দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের যে কাল্পনিক পরিকল্পনা এতদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্ব লালন করেছে তা বলতে গেলে একপ্রকার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের পাশাপাশি নতুন ইহুদি বসতি স্থাপন, ফিলিস্তিনিদের সশস্ত্র প্রতিরোধে অব্যাহত বোমা হামলা এবং ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান ছাড় প্রাপ্তির কারণে আরও বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দেয়।  কিন্তু ফিলিস্তিনি আলোচকরা আগেই বিষয়টি ইসরাইলের কাছে সঁপে দিয়েছেন।

কিন্তু প্রকৃতির আইনেই দখলদারিত্ব শেষ হতে চলেছে।  ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনে উভয় ক্ষেত্রেই বিষয়টি সমানভাবে প্রযোজ্য।

টানা চারবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ইসরাইলে দুই বছরের মধ্যে।  কিন্তু কোনো দলই সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।  (সর্বশেষ ৮ দল মিলে জোট করে নেসেটে আস্থাভোটে জিতে সরকার গঠন করেছে)। জোট গঠন নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে নাফতালি বেনেট এবং আইলেট শেকডকে পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ নিরপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থা শিন বেতের প্রধান।

লেবার এবং লিকুদ পার্টির আধিপত্য যখন ছিল তখনই দেশটির প্রধানমন্ত্রী আইজেক রবিনকে ১৯৯৫ সালে হত্যা করা হয়। ইসরাইলে সেদিন আর নেই।  এখন দেশটি ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে লিকুদ পার্টি থাকলেও দলের প্রধান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হারাতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পদ। দলটি শেষ নির্বাচনে ৩০ আসন পেয়েছে।

বেশকিছুদিন ধরে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সরাতে বিরোধী দলগুলো জোট করার চেষ্টায় ছিল।  এ প্রক্রিয়াকে নেতানিয়াহুর স্ত্রী সারা নেতানিয়াহুর ভাই হাগি বেন-আর্টজি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।  একইসঙ্গে ইনস্টাগ্রাম-টুইটারে ইয়ামিনা পার্টির সংসদ সদস্য নির অরবাকের বাড়ির ঠিকানা প্রকাশ করার কারণে নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ারের অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে পরাজয় অস্বীকার করেছিলেন নেতানিয়াহুও চলেছিলেন তার পথে।  তিনি নতুন জোটের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে বাগাড়ম্বর করে গেছেন।  তিনি নতুন জোটের প্রচেষ্টাকে ইতিহাসে ‘বৃহত্তম নির্বাচনী জালিয়াতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।  এ জোটকে তিনি ইসরাইলের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।

ডানপন্থি বেনেটের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে নেতানিয়াহু ‘সন্ত্রাসবাদের সমর্থক’ সমর্থিত ‘বিপজ্জনক বামপন্থি সরকার’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, যারা ইরানের মতো ইসরাইলের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়তে সক্ষম নয়।

প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেরুন র‌্যাপোপোর্ট বলেন,  যে চরম মেরুকরণের উপর নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করছিলেন সে ঘৃণা-বিদ্বেষ আজ ডানপন্থিদের গিলে খাচ্ছে। 

অপর বিশ্লেষক অর্লি নয় বলেন, ন্যায়বিচার ব্যবস্থা এবং পুলিশসহ রাষ্ট্রায়ত্ত সবকিছুই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধ্বংস করে ফেলেছেন।  এর অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্রের সবকিছুই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছে।  এখন আমরা তার কাজের ফল দেখতে পাচ্ছি।

মেরুন আরও বলেন, যদি নেতানিয়াহু জোট সরকারকে ক্ষমতা নেওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হন তবে ইসরাইল একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। (যদিও নতুন জোট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।  ক্ষমতা হারিয়েছেন নেতানিয়াহু)।

Advertisement