দেশে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভেরিয়েন্টের বিস্তার উদ্বেগ তৈরি করেছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে করোনার এ ধরনটি এরই মধ্যে রাজধানী ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় পৌঁছে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা থেকে এই ভেরিয়েন্ট সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।

দুই সপ্তাহ ধরেই ঢাকার তুলনায় শনাক্ত ও মৃত্যু দুটিই বেড়েছে ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে পরিস্থিতি পৌঁছে গেছে মারাত্মক পর্যায়ে। এ তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।

Advertisement

আগের সপ্তাহের তুলনায় দেশে করোনায় গড় শনাক্ত ও মৃত্যু দুটিই বেড়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু বেড়েছে ২৫.৩৭ শতাংশ এবং শনাক্ত বেড়েছে ২৩.৪৮ শতাংশ। ২৩ মে থেকে ২৯ মে—এই এক সপ্তাহে শনাক্ত ছিল ৯ হাজার ৬৬০ জন। এ সময় মৃত্যু হয় ২০১ জনের। ৩০ মে থেকে ৫ মে পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৯২৮ জন আর মৃত্যু হয়েছে ২৫২ জনের।

এমনকি গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় যে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ৭২ শতাংশই ঢাকার বাইরে। এর মধ্যে ঢাকার মতোই রাজশাহীতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই দিন আগেও সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল রাজশাহীতে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, রাজশাহীতে শনাক্ত বেড়েছে ৯৫.১ শতাংশ আর ঢাকায় শনাক্ত কমেছে ১১.৬ শতাংশ। ওই তথ্য অনুসারে, ২৪ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশে মোট শনাক্ত ছিল ৯ হাজার ৭৫০ জন এবং মারা গেছে ২০৭ জন। এর মধ্যে ঢাকায় সর্বোচ্চ তিন হাজার ৪৮৭ জন শনাক্ত হলেও তা আগের সপ্তাহের তুলনায় ১১ শতাংশ কম। ওই সপ্তাহে শনাক্ত সর্বোচ্চ ৯৫.১ শতাংশ (আগের সপ্তাহের তুলনায়) বেড়ে রাজশাহীতে এক হাজার ৪৮১ জন, ময়মনসিংহে ৫৭.৬ শতাংশ বেড়ে ৩২০ জন, বরিশালে ৩০ শতাংশ বেড়ে ২৪৬ জন, খুলনায় ২৪ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ১৬ জন, চট্টগ্রামে ৭ শতাংশ বেড়ে দুই হাজার ৫৯ জন, রংপুরে ৯.৬ শতাংশ বেড়ে ২৯৭ জন এবং সিলেটে ১০ শতাংশ বেড়ে ৫৪৪ জন হয়েছে। অন্যদিকে ২৪-৩০ মে পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৬৩ জন মারা গেছে চট্টগ্রামে, ৫০ জন ঢাকায়, ৩০ জন খুলনায়, ২৪ জন রাজশাহীতে, ১৬ জন রংপুরে, ১৩ জন সিলেটে, আটজন বরিশালে এবং তিনজন ময়মনসিংহে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শুক্রবার সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) থেকে তথ্য প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, দেশে ডেল্টা বা ভারতীয় ভেরিয়েন্টের সামাজিক বিস্তার ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা যেকোনো রোগ বিস্তারের সবচেয়ে বড় হাব হিসেবে দেখছেন ঢাকাকেই। তাঁদের মতে, দেশে ডেল্টা ভেরিয়েন্ট সীমান্তবর্তী এলাকায় আগে ছড়ালেও তা যেভাবে ঢাকায় এসে পৌঁছল, ঠিক সেভাবেই এখন তা ঢাকা মহানগরীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং ঢাকার বাইরে দ্রুত বিস্তারের বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় এখন যেভাবে শনাক্ত ও মৃত্যু তুলনামূলক কম আছে, সেটা আগামী দুই সপ্তাহে পাল্টে গিয়ে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠতে পারে। এ ক্ষেত্রে জরুরি হয়ে পড়েছে একাধারে সংক্রমণ রোধ ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে আবার প্রস্তুত রাখা।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে যাতে কোনোভাবেই কেউ ঢাকা বা অন্য জেলায় যেতে না পারে, সে জন্য আমাদের পরামর্শ অনুসারে স্থানীয় প্রশাসনকে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। এর পরও মানুষ নানা কৌশলে ওই এসব এলাকা থেকে বের হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকায় ডেল্টা ভেরিয়েন্ট ছড়ালে তা ঠেকানো কঠিন ব্যাপার। এখান থেকে আবার সারা দেশে ছড়ানোর ঝুঁকি থেকেই যায়। মানুষ সতর্ক না হলে আইন প্রয়োগ করে এমন মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা সব ক্ষেত্রে সহজ বিষয় নয়।’

অধ্যাপক নাসিমা আরো বলেন, ‘ঢাকায় সংক্রমণ বিস্তারের দিকে আমাদের সতর্ক নজর রয়েছে। হাসপাতালগুলো প্রস্তুত আছে। এখন সব হাসপাতালেই রোগী কম। আশা করি সমস্যা হবে না।’

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর বলেন, ‘আমরা মাত্র ৫০ জনের নমুনা পরীক্ষা করেছি। এর মধ্যে ৪০ জনের শরীরেই ডেল্টা বা ভারতীয় ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে। এর মানে এটা নয় যে এই ৪০ জনের মধ্যেই এই ভেরিয়েন্ট আটকে আছে। বরং এটি সামাজিক সংক্রমণের মাধ্যমে অবশ্যই আরো বিস্তার ঘটেছে। সেটা মাথায় রেখেই আমাদের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, ‘যেহেতু ডেল্টা ভেরিয়েন্ট অনেক দ্রুত বেশি মাত্রায় ছড়ায়, তাই ঢাকার ক্ষেত্রে আমাদের উদ্বেগ অনেক বেশি। সময়মতো আমরা গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ না করে বরং খুলে দেওয়ায় এ বিপদ ডেকে আনা হলো। প্রতিদিনই সারা দেশ ঢাকায় মানুষ যাওয়া-আসা করছে; আমরা কেউ জানি না কে কিভাবে এই ভাইরাস ঢাকা থেকে বহন করে অন্য জেলায় নিয়ে যাচ্ছে বা নিয়ে আসছে।’ তিনি বলেন, এখন এই ভেরিয়েন্ট ঠেকাতে হলে ঢাকাসহ যেখানেই এই রোগী পাওয়া যাবে তাকে তাৎক্ষণিক সরকারি ব্যবস্থাপনায় আইসোলেশনে নিতে হবে। ঢাকায় যেহেতু হাসপাতালের বেড এখন খালি পড়ে আছে, তাই ঢাকায়ও এটা খুব কাজে দেবে। কারণ বাসায় থাকলে ঠিকমতো আইসোলেশন হয় না বরং কোনো না কোনোভাবে অন্যদের মধ্যে তা ছড়ানোর সুযোগ থেকে যায়। এ ছাড়া কন্টাক্ট ট্রেসিংয়েও গুরুত্ব দিতে হবে আরো বেশি। পরীক্ষা বাড়াতে হবে। টিকারও সংস্থান করতে হবে দ্রুত।’

Advertisement