আফগানিস্তানের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য ড্রয়ে সব চাপ-তাপের আপাতত একটা হিল্লে হয়েছে। বাংলাদেশ দলের পয়েন্টের অঙ্ক মিলেছে। জেমি ডে’র চাকরিও আপাত রক্ষা হয়েছে বলে ধারণা।

বহুমুখী চাপ নিয়েই বাংলাদেশ ফুটবল দল কাতার গেছে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের শেষ তিন ম্যাচ খেলতে। বিশেষ চাপ ছিল জেমির ওপর। এই ইংলিশ কোচের চাকরিটা যেন সুতায় ঝুলছে। ফুটবল ফেডারেশনের একটি পক্ষ বেজায় অসন্তুষ্ট তাঁর পারফরম্যান্সে। মাঝে বাফুফে সহসভাপতি আতাউর রহমান ভুঁইয়া রটিয়ে দিয়েছিলেন কোচের চাকরি যাওয়ার ভুয়া খবর। গত মার্চে নেপালে তিন জাতি টুর্নামেন্টে ফাইনাল হারের পর খোদ বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনও অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ফলে জেমির ভাগ্যটা গিয়ে ঠেকেছে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের শেষ তিন ম্যাচে।

Advertisement

কোচের ওপর অসন্তুষ্টির দুটি কারণ হতে পারে। একটি হলো, কাতারের অনুরোধে অপ্রস্তুত অবস্থায় গত ডিসেম্বরে দোহায় গিয়ে ম্যাচটি খেলতে চাননি কোচ। এ নিয়ে জেমি দু-চার কথা বলেছিলেন সংবাদমাধ্যমেও। আরেকটি হলো, বহুল আলোচিত তাঁর রক্ষণাত্মক কৌশলের খেলা পছন্দ হচ্ছে না বাফুফে কর্তাদের। তাঁদের হয়তো বিশ্বাস, আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললে বাংলাদেশের জয়ের পাল্লা ভারী হতো। পরশু আফগানিস্তানের ম্যাচের পরও তোলা হয়েছিল প্রসঙ্গটি। ৮৪ মিনিটে গোল করে ম্যাচ ড্র করেছে বাংলাদেশ, শুরু থেকে আক্রমণাত্মক খেললে কি ম্যাচ জেতার সুযোগ থাকত না? জেমির সোজাসাপ্টা জবাব, ‘কোনোভাবে সম্ভব নয়। শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ওপেন ম্যাচ খেললে আমাদের মাসুল গুনতে হবেই। আফগানিস্তান ম্যাচে আমরা সব সময় গেমে থাকার চেষ্টা করেছি, তাতে ১ পয়েন্ট মিলেছে। অন্যথায় এই ম্যাচ হারতে পারতাম।’ শক্তিতে আফগানিস্তান এগিয়ে—এই সত্যটা মেনে নিয়ে গোলদাতা তপু বর্মণের উপলব্ধি হলো, ‘৭০ মিনিট শেষে আফগানরা খানিকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এবং তারা গোলটি ধরে রাখার দিকে মনোযোগী হওয়ায় আমরা খেলার জায়গা পেয়েছিলাম। আমাদেরও হারানোর কিছু ছিল না, তাই সবাই আক্রমণে উঠেছিলাম এবং গোল আদায় করেছি। কিন্তু শুরু থেকে রক্ষণ সামলে না খেললে দুই-তিন গোল খেয়ে বসতাম। তখন এক গোল ফেরালেও কোনো লাভ হতো না।’

শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ছোট দল রক্ষণাত্মক খেলবে, এটাই স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে কাউন্টারে চেষ্টা করবে, তাতে গোল মিললে দুর্দান্ত এক চমক হয়। এই ফর্মুলার বাইরে গিয়ে আক্রমণের বিলাসিতা দেখানো মানে আত্মহননের পথে হাঁটা। পেশাদার কোচ হিসেবে জেমি সেটা করতে পারেন না, ফুটবল কোচিং বুক অনুযায়ী খেলাতে গিয়েই তিনি হয়েছেন বিরাগভাজন। বাংলাদেশ দল এবং তাঁর ফুটবলারদের সামর্থ্য সম্পর্কে জেমির ধারণা স্পষ্ট। তাঁদের পায়ে বল রেখে খেলার সামর্থ্য নেই। মাঝমাঠে সেরকম সৃষ্টিশীলতা নেই আর ফরোয়ার্ড লাইনও কানা। সেটা আরো ভালো বোঝা যায়, সমশক্তির প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে নামলে। তখন জেতার জন্য খেলতে হয়, তাতে রক্ষণভাগে ফাঁকফোকর তৈরি হয় এবং গোল হজম করে বসে। এ কারণে নেপালে তিন জাতি কাপেও হয়েছে ভরাডুবি। আসলে ম্যাচ জেতার জন্য দু-তিনজন ম্যাচ উইনার লাগে, যাঁরা মাঠে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। সেটা না থাকায় ইংলিশ কোচ তাঁর মতো করে দলটির মধ্যে তৈরি করেছেন দুর্দান্ত ‘টিম-ওয়ার্ক’। এই দলে ফুটবলাররা ফিটনেসের চূড়ান্তে থাকবে, মাঠে দৌড়-ঝাঁপ করবে এবং রক্ষণে সাহায্য করবে। এরপর সুযোগ পেলে আক্রমণে উঠবে। এই হচ্ছে জেমির থিওরি।

এভাবে করে তিনি যে খুব খারাপ করেছেন, তা বলা যাবে না। এ পর্যন্ত ২৫ ম্যাচে ১০টি জয়ের পাশাপাশি চারটি ড্র আছে তাঁর। এর মধ্যে দুর্দান্ত ড্র ম্যাচটি আফগানিস্তানের বিপক্ষে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের শেষ তিন ম্যাচের প্রথম পরীক্ষায় ১-১ গোলের এই নাটকীয় ড্রয়ে বাংলাদেশের পয়েন্টের স্বপ্ন সফল হওয়ার পর কোচ কি খানিকটা নির্ভার। তিনি আগের মতোই বলছেন, ‘চাকরি নিয়ে ভাবছি না।’

kalerkantho

Advertisement