নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের ‘হাসেম ফুডস’ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৫২ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ আবুল হাসেমসহ আসামিরা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। ভবনে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থাসহ সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা না রাখা এবং দুর্ঘটনার পরও ভবনের তালা খুলে কর্মীদের রক্ষা না করার ব্যাপারে তাঁদের ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানায় সূত্র।

জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা দাবি করেন, কারখানা থেকে জুস, তরল পানীয়র গুঁড়া (সজীব ট্যাং), নুডলস, নেসলে, সেমাইসহ বিভিন্ন খাবার চুরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই গেটে তালা মেরে রাখা হয়। জীবিত শ্রমিকরাও জানিয়েছেন, খাবার চুরির অজুহাতে তাঁদের কয়েক স্তরে তালা মেরে আটকে কাজ করানো হতো। তবে কারখানা থেকে খাবার চুরির নজির নেই। কারণ সেখানে নজরদারি থাকে সব সময়। আগুন লাগার পরও মালিকপক্ষের অনুমতি নেই বলে তলার ইনচার্জরা গেটের তালা খোলেননি। এক পর্যায়ে একদল শ্রমিক চারতলায় একটি অংশে গিয়ে আটকে মারা যান।

Advertisement

এদিকে গতকাল রবিবার ফায়ার সার্ভিসের তদন্তকারী দল গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে কারখানার ভেতর থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে। সেখানে গেছে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল। গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ ও গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তাঁরা ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানান।

অন্যদিকে গতকালও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে স্বজনের লাশের জন্য আহাজারি করেছে স্বজনরা। তাদের কয়েকজন লাশ শনাক্ত করতে নমুনাও দিয়েছে। সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের প্রধান এস এস রুমানা আক্তার বলেন, ‘তিন দিনে আমরা ৪৫ জন ভিকটিমের বিপরীতে ৬৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছি। নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে মা-বাবা ও সন্তানদের অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আগেও বলেছি নিহতরা এক্সট্রিম পর্যায়ের দগ্ধ ছিলেন; যার কারণে তাঁদের দাঁত ও হাড়ের মাধ্যমে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। এ কারণে ডিএনএ পরীক্ষা করতে সময় লাগছে।’ কত দিন পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামী আরো দু-এক দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এর পরও ভিকটিমদের স্বজনরা নমুনা দিলে তা সিআইডি কার্যালয়ে গিয়ে দিতে পারবে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, ৩০২ ধারার মামলায় গ্রেপ্তার সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম, তাঁর ছেলে হাসিব বিন হাসেম, তারেক ইব্রাহিম, তাওসীব ইব্রাহিম, তানজিব ইব্রাহিম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহেন শাহ আজাদ, উপমহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সালাহউদ্দিনকে চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা ভবনে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ছিল বলে দাবি করলেও প্রমাণ দিতে পারছেন না। কর্মীদের কেন বের হতে দেওয়া হয়নি—এমন প্রশ্নে আবুল হাসেম দাবি করেন, তৈরি করা খাবার সামগ্রী চুরি ঠেকাতে কঠোর নজরদারির অংশ হিসেবে তালা মেরে রাখা হয়। অগ্নিকাণ্ডের পরও কেন তালা খোলা হয়নি—এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বারবার বলছেন, ‘কারখানা করে কি ভুল করেছি? এখানে অনেক মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা করেছি।’ তদন্তকারীরা তথ্য পেয়েছেন, খাবার চুরির অজুহাতে কঠোরভাবে শ্রমিকদের বন্দিদশায় কাজ করানো হতো। এসব ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের এসপি জাহেদুল আলম বলেন, ‘তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। অগ্রগতি আছে। এ ব্যাপারে পরবর্তীতে জানানো হবে।’ এ মামলায় আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানান তিনি।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে নিচতলায় বিদ্যুতের গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত বলেই আলামত পাওয়া যাচ্ছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে আলামত যাচাই করা হচ্ছে। আগুন লাগার কারণের সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়া এবং মৃত্যুর কারণগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভবনটিতে দাহ্য পদার্থের সঙ্গে কয়েকটি রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানায় সূত্র।

Advertisement