আন্তর্জাতিক বাজারে যখন এলপি গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী তখন বাংলাদেশের বাজারে নতুন করে দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বিইআরসি। আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, গত মে মাসে প্রপেনের দাম ছিল প্রতি টন ৪৯৫ ডলার আর বিউটেনের দাম ছিল প্রতি টন ৪৭৫ ডলার। চলতি জুন মাসে যা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে প্রপেন প্রতি টন ৫৩০ ডলার এবং বিউটেন প্রতি টন ৫২৫ ডলার।

গত মে মাসে বিইআরসি এলপি গ্যাসের প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে দেয় ৯২০ টাকা। সেখানে কি না জুন মাসে দাম বেড়ে যাওয়ার পরও তা কমিয়ে নিয়ে আসা হয় ৮৪২ টাকায়। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন এলপি গ্যাসের দাম টনপ্রতি প্রায় ৪৫ ডলার বৃদ্ধি পেল, তখন বিইআরসি ১২ কেজি সিলিন্ডারে ৭৮ টাকা দাম কমিয়ে যেন এক ছেলেখেলা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার পরও সিলিন্ডারের দাম কমিয়ে দেওয়া যেন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ীদের জন্য এক অশনি বার্তাই বহন করছে।

Advertisement

২০১৩ সালে বাংলাদেশে এলপিজি চাহিদা ছিল মাত্র ৮০ হাজার মেট্রিক টন, কিন্তু বর্তমানে তা ১২ লাখ টন ছাড়িয়েছে। ধারণা করা হয়, ২০২৫ সালের মধ্যে চাহিদা ২৫ লাখ টন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সাড়ে ৩০ লাখ টনে পৌঁছে যাবে। এখন পর্যন্ত এই খাতের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত আছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। এই বিশাল বিনিয়োগের বেশির ভাগই এসেছে ব্যাংক ঋণ থেকে।

বিইআরসির সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনায় ও গণশুনানিতে বাংলাদেশের অপারেটররা তাদের সব ধরনের খরচসহ অন্যান্য সব ব্যয় তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে দাম নির্ধারণে সব ধরনের ফ্যাক্টর তুলে ধরেন, যাতে বিইআরসি কতৃক দাম নির্ধারণে ভোক্তা ও অপারেটর কারো অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। গত এপ্রিলে প্রথমবারের মতো সিলিন্ডার ও অটোমোবাইলের জ্বালানিতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। কিন্তু সেই দাম নির্ধারণে ৩২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগকে বাঁচিয়ে রাখা, ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বিইআরসির মনগড়া দাম নির্ধারণ যেন দেশের সুন্দর ও সমৃদ্ধ ব্যাবসায়িক খাত তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসে (এলপিজি) ৩২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগকে বিপদে ফেলা হয়েছে এবং এই খাতের প্রবৃদ্ধিকে বাধা দেওয়ার এক বহুমুখী ষড়যন্ত্র হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্য যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের মতো জ্বালানি অপর্যাপ্ততার মুখোমুখি। সরকার এরই মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের জন্য মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ পরিবারকে পাইপলাইন সংযোগের মাধ্যমে সংযুক্ত করেছে, যা বাংলাদেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ১২ শতাংশ।

দামে কম ও সহজলভ্যতার কারণে এলপিজি ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক গ্যাসের স্থানটি দখল করে নেয় এবং গৃহস্থালির পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতেও এটি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের রিজার্ভ হ্রাসের কারণে স্থানীয় শিল্পগুলো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের জন্য ধীরে ধীরে এলপিজির দিকে ঝুঁকছে। এলপিজি সম্পূর্ণ আমদানিভিত্তিক পণ্য, যার প্রায় ৯৮ শতাংশ আমদানীকৃত এবং বেশির ভাগ টার্মিনাল মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের দাখিলকৃত রিটের অধীনে হাইকোর্ট গত বছরে বিইআরসিকে এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণের দায়িত্ব আরোপ করেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জানুয়ারির ১৪ তারিখে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণে গণশুনানির আয়োজন করা হয়। আলোচনায় বলা হয়, সৌদি আরামকোর মাসিক ঘোষিত দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসেই এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হবে এবং দাম নির্ধারণে ভোক্তা ও অপারেটর উভয়েই যাতে লাভবান হয়, সেসব দিক মূল্যায়ন করা হবে; কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে তা যেন এক ছেলেখেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।

Advertisement