রাজশাহী অঞ্চলে এখন আমের ভরা মৌসুম চলছে। এ অঞ্চলের চাষিদের প্রধান অর্থকরী ফসল আম। তবে চাষিদের প্রতিনিয়ত ঠকাচ্ছেন আড়তদাররা। দামের পাশাপাশি ওজনেও ঠকছেন চাষিরা। ৪০ কেজিতে সব পণ্যের মণ হলেও আড়তদারদের কাছে ৪৮ কেজিতে আমের মণ। সংশ্নিষ্টদের দাবি, করোনা পরিস্থিতি ও লকডাউনের কারণে বাইরের পাইকার-ব্যবসায়ী কম আসায় আমের দাম পাচ্ছেন না চাষিরা।

রাজশাহী অঞ্চলের অন্যতম বড় আমের হাট বসে বানেশ্বরে। এই হাটে প্রতিদিনই বিভিন্ন জাতের শত শত মণ আম উঠছে। ভালো জাতের ল্যাংড়া, ক্ষীরশাপাতি বা হিমসাগর ছাড়াও লক্ষ্মণভোগ, আম্র্রপালি, গুটি, ফজলি আম বিক্রি হচ্ছে। ল্যাংড়া ও ক্ষীরশাপাতি আমের দাম কিছুটা ভালো থাকলেও পানির দরে বিক্রি হচ্ছে লক্ষ্মণভোগ ও গুটি আম। লক্ষ্মণভোগ আমের মণ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। ৪৮ কেজিতে মণ হওয়ায় প্রতি কেজির দাম পড়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা। অনেকে আবার এই দামেও ক্রেতা পাচ্ছেন না। চাষিরা জানান, এই দামে আম বিক্রি করার জন্য শ্রমিক দিয়ে আম নামানো এবং হাটে তোলার জন্য ভ্যান ভাড়াও উঠছে না। ফলে অনেক চাষি আম নামাচ্ছেন না। আম পেকে গাছের নিচেই পড়ে নষ্ট হচ্ছে। তবে ল্যাংড়া ও ক্ষীরশাপাতি আম বিক্রি ভালো হচ্ছে বলে চাষিরা জানান।

Advertisement

পুঠিয়া উপজেলার আম ব্যবসায়ী ও চাষি সিরাজুল ইসলাম জানান, লক্ষ্মণভোগ বিক্রি করে আম নামানো এবং ভ্যান ভাড়া উঠছে না। মানভেদে হাটে ল্যাংড়া ও ক্ষীরশাপাতি বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ থেকে ২২০০ টাকা মণ পর্যন্ত। লক্ষ্মণভোগ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ। আম্রপালি ১৭০০ থেকে ২০০০ টাকা, ফজলি ও গুটি আম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে।

আমচাষি সিদ্দিক হোসেন বলেন, এত কম দামে আম বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠবে না। এবার সব চাষির লোকসান হবে।

বানেশ্বর হাটের আড়তদার সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, আগে আম বিক্রি হতো পিস হিসেবে। তখনও ঢলন (ঢলতা) ছিল। অন্তত ১০ বছর আগে ৪৬ কেজিতে মণ ধরা হয়। কোথাও কোথাও ৫২ কেজিতেও মণ ধরা হয়। এটাই আমসহ কাঁচামাল বিক্রির নিয়ম।

তিনি বলেন, ইউএনও অনেক চেষ্টা করেও ৪০ কেজিতে মণ করতে পারেননি। ৪০ কেজিতে মণ ধরা হলে পাইকারি ক্রেতা সংকটে পড়বে হাট। তখন চাষিরা আম বিক্রি করতে না পেরে আরও বিপদে পড়বেন।

আরেক আড়তদার নজরুল ইসলাম বলেন, জন্ম থেকেই আমের মণ ধরা হয় ৪৬ থেকে ৪৮ কেজিতে। এটা চাষিদের সঙ্গে দামদর করার সময়ই কত কেজিতে মণ ধরা হবে সে বিষয়টি চূড়ান্ত করে কেনাবেচা হয়। তবে ৪৬ কেজির নিচে এবং ৪৮ কেজির ওপরে নেওয়া হয় না।

চাষিরা জানান, কয়েক বছর আগে আমের পাইকার ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা ৪২ কেজিতে মণ চালু করেন। এরপর ৪৪ কেজিতে মণ চালু করেন। গত তিন-চার বছর আগে তারা ৪৮ কেজিতে মণ চালু করেন।

আড়তদারদের ভাষ্য, আম কাঁচামাল হওয়ায় অনেক সময় তা পচে যায়। তাই ভর্তুকি হিসেবে চাষিদের কাছে থেকে তারা ৪৮ কেজিতে মণ নেন। তবে চাষিরা বলছেন, ৪৮ কেজিতে আড়তদাররা মণ ধরে কেনেন, তারা কখনোই ৪০ কেজির বেশি মণ ধরে বিক্রি করেন না।

পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল হক আনাছ বলেন, ৪৮ কেজিতে মণ বা ঢলতা প্রথা একটি জুলুমের নাম। প্রায় ১৫০ জন আড়তদারের একটি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে চাষিরা ৪৮ কেজিতে মণ দিতে বাধ্য হন। চাষিরা কখনোই তাদের পরিশ্রমের ফসল ৪৮ কেজিতে মণ দিতে চান না। হাটের সব ব্যবসায়ী ও চাষিকে ৪০ কেজিতে মণ ধরে কেনাবেচা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে বৈঠকও করা হয়েছে। তবে আড়তদারের কাছে জিম্মি চাষিরা। এ নিয়ে চাষিরাও কোনো অভিযোগ করতে চান না। আর এটা শুধু বানেশ্বরেই নয়, রাজশাহী-চাঁপাইসহ সবখানেই এমন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। যে কারণে শুধু পুঠিয়ায় বন্ধ করা সম্ভব নয়। কঠোর আইন ও নির্দেশনা জারি করে কেন্দ্রীয়ভাবেই ৪০ কেজিতে মণ বাস্তবায়ন করতে হবে।

রাজশাহী ফল গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলীম উদ্দীন বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে আগের মতো মানুষ আসতে পারছে না। এ কারণে আমের দাম কম।

তিনি বলেন, ভরা মৌসুম হওয়ায় ল্যাংড়া, ক্ষীরশাপাতিসহ অনেক ভালো জাতের আম পাকা শুরু হয়। কিন্তু সে তুলনায় লক্ষ্মণভোগের স্বাদ কম। তাই এ সময় লক্ষ্মণভোগের দাম পান না চাষিরা। চাষিরা লক্ষ্মণভোগের চাষ কমিয়ে আগাম জাত ও বিলম্ব জাতসহ বারো মাসি আম চাষ করলে তবে লাভবান হতে পারেন।

আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জেরও একই অবস্থা বলে জানিয়েছেন আমাদের শিবগঞ্জ প্রতিনিধি একেএস রোকন। উপজেলার চককীর্ত্তির আমচাষি জাহাঙ্গীর বিশ্বাস জানান, গত পাঁচ বছর আমের ব্যবসা করতে গিয়ে তার ২০ লাখ টাকা পুঁজি হারিয়েছেন। এখন নিজের বাগানগুলোই শুধু পরিচর্যা করছেন। আম নিয়ে আর তিনি স্বপ্ন দেখেন না।

দেশের বৃহত্তম আমবাজার কানসাটে আসা এক কৃষক জানান, তিনি গত বছর ক্ষীরশাপাতি ও ল্যাংড়া দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন। এ বছর ক্রেতা না থাকায় স্থানীয় আড়তদারদের এক হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

চাতরার আমবাগান মালিক মোজতাবা আলম বাদল জানান, তিনি কোনো বাগানই এ বছর বিক্রি করতে পারেননি। আম পেড়ে বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে গড়ে ৭০০ টাকা মণ দাম পাচ্ছেন তিনি। শ্রমিক ও ভ্যান ভাড়া মিটিয়ে তার ৩০০ টাকা থাকছে। বাগান পরিচর্যার খরচ সব লোকসান।

রানাহাটির এক আমচাষি বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে আম নিয়ে কানসাট যাওয়ার সময় জানান, উপায় তো নেই। আম তো পেকে যাচ্ছে। দাম না থাকলেও তা বেচতে হবে।

আড়তদারদের দাবি, তারা ৫০ থেকে ৫৫ কেজিতে মণ ধরে এবং কম দামে আম কিনেও আতঙ্কে আছেন। মোকামগুলোতে আমের দাম না পাওয়ায় তারাও বাধ্য হচ্ছেন কম দামে আম কিনতে।

কানসাট আম আড়তদার সমিতির সভাপতি ওমর ফারুক টিপু জানান, বাজারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আম নামানো হলেও বাইরের ক্রেতা কম। তাছাড়া এবার আমের সরবরাহ বেশি। তাই আম নিয়ে কিছুটা সংকট তো আছেই।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ বছর আড়াই লাখ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। উৎপাদিত হয়েছে প্রায় তিন লাখ টন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, এ বছর করোনার প্রভাবে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা লোকসান হবে জেলার আমচাষিদের।

Advertisement