ইন্টারনেটভিত্তিক বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিজ্ঞাপন প্রচারের আড়ালে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা। তবে এই খাতে ঠিক কী পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে যাচ্ছে, তার কোনো সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই। সরকারের কোনো দপ্তরও জানে না, এ খাতে কী পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপসহ যোগাযোগের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দিতে গিয়ে বছরে হাজার কোটির বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। সরকার এক টাকাও রাজস্ব পাচ্ছে না।

এই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে সরকার। এরই মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন করেছে। সরকার চাইছে আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে। তাহলে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অপপ্রচারও বন্ধ করা যাবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উন্নত জোট জি-৭ যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, সেটিকে উদাহরণ ধরে বাংলাদেশও আরো সোচ্চার হতে পারে।

Advertisement

সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো জানিয়েছে, বহুজাতিক কম্পানিগুলোকে করজালে আনতে এরই মধ্যে চাপ দেওয়া শুরু হয়েছে। গুগল, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, অ্যামাজন, নেটফ্লিক্স, মাইক্রোসফট, ইমো, টিকটক, লাইকিসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয়েছে, তারা যদি দ্রুত ব্যবসায় নিবন্ধন নম্বর বা বিআইএন না নেয়, তাহলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ দেশে তাদের ব্যবসার সুযোগ আটকে দেওয়ার উদ্যোগ নেবে।

এরই মধ্যে গত ২৩ মে গুগলের আওতাধীন ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ২৭ মে অ্যামাজন ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেট থেকে অনাবাসী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআইএন নিয়েছে। এখন থেকে দুটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করে ভ্যাটের টাকা পরিশোধ করবে।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ভ্যাট নিবন্ধন সহজ করতে চলতি বছরের বাজেটে ভ্যাট আইনেও কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। পরিবর্তিত নতুন আইনে বহুজাতিক এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নিতে কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এত দিন কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানকে মূল প্রতিষ্ঠানের দায়ভার নিতে হতো। এ জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনে কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাত না।

এদিকে ভোক্তাদের ফাঁদে ফেলতে বিভিন্ন সময় রহস্যজনক আচরণ করতে দেখা গেছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বিশেষ করে বিজ্ঞাপনের বাজার ধরতে গুগলের কৌশলকে একাধিকবার কাঠগড়ায়ও তুলেছে বহু দেশ। অনৈতিক একাধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে সর্বশেষ গত সোমবার গুগলকে ২৬ কোটি ডলারের বেশি জরিমানা করেছে ফ্রান্স। বিপুল অঙ্কের জরিমানার খড়্গ নেমে আসায় সুর পাল্টে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, শুধু ফ্রান্সে নয়, বিশ্বের সর্বত্র নিজেদের অনলাইন অ্যাড নীতিতে বেশ কিছু বদল আনছে তারা।

জানা গেছে, বিজ্ঞাপনের বাজার ধরতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নানা কায়দায় প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে সাধারণ মানুষকে। সুযোগ বুঝে একটি চক্র এসব প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে সরকারবিরোধী অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশে বসে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এটি প্রতিরোধের অংশ হিসেবেও সরকার বিদেশি এসব প্রতিষ্ঠানের অফিস দেশে আনার বিষয়ে কাজ করছে।

এদিকে কারো কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও আদালতে দাখিল করা বিটিআরসির এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু তিনটি বেসরকারি মোবাইল ফোন কম্পানি পাঁচ বছরে বিদেশে পাঠিয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ থেকে এই অর্থ পেয়েছে গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ এনে কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ৯ এপ্রিল রিট দায়ের করেন হাইকোর্টের ছয়জন আইনজীবী। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইন খাতে বিজ্ঞাপনের তথ্য তুলে ধরে বিটিআরসি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রচার বাবদ গ্রামীণফোন ৪৩ কোটি ৩১ লাখ ২৫ হাজার ৬২৯ ডলার, রবি ৩২ কোটি ১৩ লাখ ৩৮ হাজার ডলার এবং বাংলালিংক ২৮ কোটি ৬৪ লাখ ৬৯ হাজার ৯৬৭ ডলার খরচ করেছিল। তিন প্রতিষ্ঠান মিলে ব্যয় করেছিল ১০৪ কোটি ৯ লাখ ডলারের বেশি।

বিটিআরসি সূত্র বলছে, গত দুই বছরে ইন্টারনেটভিত্তিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রবণতা অনেকাংশে বেড়েছে। বিশেষ করে গত বছরের শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে অনলাইনের ব্যবহার বেড়ে যায়। এতে স্বাভাবিকভাবে অনলাইনের দিকে ঝুঁকে পড়ে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

কয়েকজন কর্মকর্তা ধারণা করে বলছেন, এই খাতে আগের পাঁচ বছরে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বিদেশে গেলেও এর পরের দুই বছরে অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিদেশে গেছে। সব মিলিয়ে গত সাত বছরে শুধু মোবাইল ফোন কম্পানিগুলোই বিদেশে পাঠিয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে কয়েক হাজার বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিদিন বিদেশে টাকা পাঠাচ্ছে। সে হিসাবে গত সাত বছরে বিদেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার কম নয়। তাঁরা আরো বলছেন, ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হলে শুধু এই খাতে সরকারের কোষাগারে জমা হতো তিন হাজার কোটি টাকা।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সভাপতি শমী কায়সার বলেছেন, দেশে শুধু ই-ক্যাবে নিবন্ধিত আছে দেড় হাজার প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান, এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে উঠেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এদের প্রায় প্রত্যেকেই অনলাইননির্ভর। তারা প্রতিনিয়ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞাপন দিয়ে যাচ্ছে। করোনার কারণে অনলাইন মার্কেট আগের তুলনায় অনেক বড় হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য সারা পৃথিবীই এখন একটি মার্কেট। আবার সারা পৃথিবীর জন্য বাংলাদেশও একটি মার্কেট। এখানে জরুরি হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো কোন প্রক্রিয়ায় বা কিভাবে করজালে আসবে, তার পলিসি ঠিক করা। পলিসি এমনভাবে করতে হবে, যাতে দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মেম্বার (ভ্যাট পলিসি) মাসুদ সাদিক বলেন, ‘বহুজাতিক কম্পানিগুলোকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনতে আমরা কাজ করছি। এ জন্য এবারের বাজেটে ভ্যাট আইনে কিছুটা পরিবর্তনও এনেছি। আগে গুগল, ফেসবুক ও অ্যামাজনের মতো কম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে নিবন্ধন নিতে হলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে এসব প্রতিষ্ঠানের সব দায়ভার নিতে হতো। তাই তাদের নিবন্ধনের দিকে আগ্রহী করা যায়নি। এখন আইন পরিবর্তন করে আমরা শুধু নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানকেই দায় নেওয়ার বিধান করেছি। আমরা চাই এসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আসুক। তার পরও যদি না আসে তাহলে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। বিটিআরসিকে দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (মূল্য সংযোজন কর) মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বলেন, গুগল, অ্যামাজন, ফেসবুক, ইউটিউব, নেটফ্লিক্সসহ অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারকে ভ্যাট দিয়ে আসছে। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যত লেনদেন হয়েছে, সব লেনদেন থেকেই সরকার ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পেয়েছে। কিন্তু এগুলো সবই হয়ে আসছে বিচ্ছিন্নভাবে।

বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেন ও মুনাফার তথ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো হিসাব এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে নেই। কারণ এত দিন তারা আমাদের কোনো প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছিল না। এ জন্য তাদের আয়, লেনদেন কোনো কিছুই আমরা জানতাম না। এসব প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণে ভ্যাট দিয়েছে বা ব্যাংক কোন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কত টাকা ভ্যাট নিয়েছে, তা জানার সুযোগ ছিল না। অর্থাৎ ভ্যাটের তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতিই ছিল না। এ জন্য সঠিক হিসাব ও রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট নিবন্ধন জরুরি।’

ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার প্রমিলা সরকার বলেন, বহুজাতিক অনলাইন ফ্ল্যাটফর্মনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনতে কাজ চলছে। এরই মধ্যে গুগল (ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ) ও অ্যামাজন ভ্যাট নিবন্ধন নিয়েছে। ফেসবুকও তাদের সব কাগজপত্র প্রস্তুত করেছে। আগামী সপ্তাহে ফেসবুকও নিবন্ধন নেবে। এ ছাড়া নেটফ্লিক্স, মাইক্রোসফটসহ অন্য যারা আছে, তাদেরও ভ্যাট নিবন্ধন নিতে হবে। না হয় তারা বাংলাদেশে ব্যবসা করতে পারবে না। আইন অনুযায়ী বিটিআরসি এগুলো বন্ধ করে দেবে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বহুজাতিক গুগল-ফেসবুক প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে ব্যবসা করছে। আমরা আগে থেকেই আলাদা নীতিমালা করে এদের করের আওতায় আনার কথা বলে আসছি। এখন ভালো সময় আসছে। কারণ উন্নত দেশের জোট জি-৭ এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর উচ্চ হারে কর আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সুযোগটা বাংলাদেশ নিতে পারে।’

অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট-ট্যাক্সের মূল্য দেশীয় কম্পানির মতো হলে হবে না। ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হলে তার সঙ্গে সাড়ে ২৭ শতাংশ করপোরেট ট্যাক্সও আদায় করতে হবে। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট উইং বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান থেকে এনবিআর তথ্য নিতে পারে। এটা না করলে ওরা যা দেবে আপনাকে তা-ই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।’

Advertisement